দেলদুয়ার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নানা সংকটে চিকিৎসা ব্যাহত!

দেলদুয়ার পরিবেশ প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য

দেলদুয়ার প্রতিনিধি: দেলদুয়ার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫০ শয্যার অবকাঠামো থাকলেও ৩১ শয্যার জনবল দিয়ে চলছে সেবা কার্যক্রম। দীর্ঘদিনের জনবল সংকট, চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতিসহ নানা সমস্যায় খুঁড়িয়ে চলা হাসপাতালটিতে ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা।

 

জায়গার সংকুলান না হওয়ায় বারান্দায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের। অথচ পাশেই ৫০ শয্যার একটি ভবন দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সরকারি এ হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল উপজেলার লাখো মানুষ। স্থানীয়রা দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে ৫০ শয্যার সেবা চালু করার দাবি জানালেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ৫০ শয্যার কার্যক্রমের জন্য একাধিকবার চিঠি দিয়েও সমস্যার সমাধান হয়নি।

 

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করে নতুন ভবনের উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু ৩১ শয্যার জনবল দিয়েই চলছে হাসপাতালের কার্যক্রম। হাসপাতালে জনবলের ১২৯টি পদের মধ্যে ৩৭টিই শূন্য রয়েছে। চারজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের জায়গায় কর্মরত মাত্র দুজন। এর মধ্যে একজন কনসালট্যান্ট (মেডিসিন), অপরজন গাইনি। এদের মধ্যে আবার মেডিসিন কনসালট্যান্ট টাঙ্গাইল ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে প্রেষণে কর্মরত।

২৯ জন নার্সের জায়গায় কর্মরত ২৪ জন। ছয়জন সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকের জায়গায় পদ শূন্য রয়েছে দুজনের। এছাড়া জরুরি মেডিকেল অফিসার একজন, স্বাস্থ্য সহকারী পাঁচজন ও জুনিয়র কনসালট্যান্ট দুজনের পদ শূন্য রয়েছে।

অন্যান্য পদগুলোর মধ্যে সহকারী নার্স, আয়া, ক্যাশিয়ার, বাবুর্চি, প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক, মালি, এমএলএসএস (অফিস সহায়ক), অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর, পরিসংখ্যানবিদ, স্টোর কিপার এবং ওয়ার্ড বয়ের সব কয়টি পদই শূন্য রয়েছে। ফলে হাসপাতালে আসা রোগীরা বিভিন্নভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ৩১ শয্যার জনবলের এ হাসপাতালে বহিঃবিভাগে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন। আর ভর্তি হচ্ছেন ৬০-৭০ জন। তবে জনবল সংকটে রোগীদের সেবা দিতে চিকিৎসক ও নার্সদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

হাসপাতালটি ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে হাসপাতালে নতুন কোনো চিকিৎসা সরঞ্জাম আসেনি। ফলে ১৯৮৪ সালের পুরানো এক্স-রে মেশিন দিয়েই চলছে কার্যক্রম। এতে রয়েছে ভোগান্তি। মাঝে মাঝে ভালো রিপোর্ট আসে না। ফলে হাসপাতালের বাইরে থেকে এক্স-রে করাতে হচ্ছে রোগীদের। আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনও সম্পূর্ণ সচল নয়। মাঝে মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ অ্যানালাইজার মেশিন।

হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র একটি। কিন্তু এর চালক নেই। এর ফলে রোগীদের পড়তে হচ্ছে বিড়ম্বনায়। ভাড়ায়চালিত অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে জেলা শহর কিংবা ঢাকায় যেতে হচ্ছে রোগীদের। বিশুদ্ধ খাবার-পানিরও সংকট রয়েছে। হাসপাতালের গেটের সামনেই চালকবিহীন অ্যাম্বুলেন্সটি পড়ে থাকতে দেখা যায়। গাইনি বিশেষজ্ঞের কক্ষ খোলা থাকলেও সেখানে কোনো চিকিসক দেখা যায়নি। দুপুর ১২টা ৫৮ মিনিটে প্যাথলজি বিভাগের কক্ষ বন্ধ পাওয়া যায়। রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিংয়ের কক্ষটিও ছিল বন্ধ।

রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গাইনি বিশেষজ্ঞ থাকলেও অ্যানেস্থেটিস্ট নেই। ফলে অস্ত্রোপচারও হচ্ছে না নিয়মিত। ফলে জরুরি কোনো অস্ত্রোপচারের জন্য জেলা সদর হাসপাতালে কিংবা ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে। এতে ভোগান্তি বেড়েছে রোগীদের।

দেলদুয়ার চরপাড়া গ্রাম থেকে আসা আজমত বলেন, জ্বর নিয়ে সকালে ভর্তি হয়েছিলাম। একদিন পরেই ছুটি দিয়ে দেয়। কিন্তু জ্বর ভালো হয়নি। পরে আবার হাসপাতালে এলে ভর্তি নেওয়া হয়নি। ওষুধও বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে।

রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর রাতে তালমিনা তার স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। ভর্তির পরদিন সকালে ও দুপুরে খাবার চেয়েও পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তালমিনা জানান, ডাক্তাররা ঠিকমতো রোগী দেখে না। আবার ভর্তির পর খাবার চেয়েও পাইনি। জিজ্ঞাসা করলে বলে, আপনার নাম নেই। তাহলে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে আমাদের মতো গরিব মানুষের কী লাভ?

লাউহাটি গ্রাম থেকে আসা রোগী বানেজ খান বলেন, রবিবার বেলা ১১টায় ভর্তি হয়েছিলাম। ওইদিন দিনে কোনো ডাক্তার আসেনি, শুধু নার্স এসেছিল। এভাবে একটি হাসপাতাল চলতে পারে না।

রোগীর সঙ্গে আসা কামাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাইরে ফ্লোরে ফ্লোরে রোগীদের থাকতে হয়। অপর পাশেই ৫০ শয্যার বিল্ডিং রয়েছে। কিন্তু কোনো কার্যক্রম নেই। শয্যা সংখ্যা বাড়ালে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ হতো না। তিনি আরও বলেন, এ হাসপাতালে টেস্টের ব্যবস্থা নেই। ছোটখাটো অপারেশন হয়। বড় ধরনের কোনো অপারেশন হয় না। অপারেশন করার মতো ওই রকম কোনো যন্ত্রপাতি নেই।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাজিয়া আফরিন বলেন, হাসপাতালটির ৫০ শয্যার ভবন তৈরি হলেও ৩১ শয্যা হিসেবেই সব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসছে। শয্যার সংখ্যার তুলনায় রোগী দ্বিগুণ। ফলে চাহিদার তুলায় সব কিছুই অপ্রতুল। অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও চালক নেই। হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে নতুন কোনো চিকিৎসা সরঞ্জাম আমরা পাইনি। এসব মেশিং দিয়ে রোগীদের সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। আমাদের নতুন মেশিংসহ পর্যাপ্ত চিকিৎসা সামগ্রী প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি দিয়েছি, কিন্তু আশানুরূপ ফলাফল পাইনি। ৩১ শয্যার বরাদ্দ দিয়ে বিশাল এই মানুষের সেবা দেওয়া খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *