
মির্জাপুর প্রতিনিধি: মির্জাপুর উপজেলার এক সমাজসেবক গ্রামীণ জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। উপজেলার ৯ নম্বর বহুরিয়া ইউনিয়নের ২০টি গ্রামের ৬২টি গ্রামীণ সড়ক গত তিন বছর ধরে নিজের অর্থে সংস্কার করেছেন ওই ইউনিয়নের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মরহুম জয়নাল সিকদারের ছেলে ও বিএনপি নেতা আব্দুস ছাত্তার সিকদার। এখনো তিনি সড়ক সংস্কারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
একসময় কাদামাটির পথ, খানাখন্দ আর বর্ষার পানিতে তলিয়ে থাকা রাস্তা ছিল বহুরিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দাদের নিত্যদিনের দুর্ভোগের কারণ। আব্দুস ছাত্তার সিকদারের উদ্যোগে এখন অনেক সড়কে এসেছে স্বস্তি। তাঁর এই উদ্যোগের ফলে বদলে গেছে পুরো গ্রামীণ জনপদের যোগাযোগব্যবস্থা।
স্থানীয়রা জানান, সংস্কারের আগে এই ২০টি গ্রামের সড়কগুলোর অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে অসুস্থ রোগী কিংবা গর্ভবতী নারীকে হাসপাতালে নেওয়ার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে গ্রামবাসীর ভোগান্তির কোনো শেষ ছিল না। অনেক সময় ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে গ্রামে জরুরি যানবাহন পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারত না।
সাধারণ মানুষের এই অবর্ণনীয় কষ্টের জন্য আব্দুস ছাত্তার সিকদার কোনো ক্ষমতার মোহে নয়, বরং মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে নিজ খরচে এগিয়ে আসেন। গত তিন বছরে প্রায় তিন শতাধিক মাহিন্দ্র ট্রাকে করে ভাঙা ইট (রাবিশ) ফেলে এসব সড়ক চলাচলের উপযোগী করেছেন তিনি। তাঁর বাবা মরহুম জয়নাল সিকদারও পরোপকারী ও সমাজসংস্কারক ছিলেন।
বহুরিয়া ইউনিয়নের গবড়া গ্রামের বাসিন্দা খোরশেদ আলম, হাবিবুর রহমান মুন্না, চান্দুলিয়া গ্রামের লিটন মিয়া, আমজাদ হোসেন, কোট বহুরিয়া গ্রামের শরিফুল সিকদার সুজন, রফিকুল আলম, বহুরিয়া গ্রামের আল এমরান খান, আনিছুর রহমান খান, আড়াইপাড়া গ্রামের আক্কাস আলী, নাজমুল ইসলাম, গেড়ামেরা গ্রামের ময়নাল হোসেন, ইন্নছ আলীসহ অনেকেই জানান, ছাত্তার সিকদারের এই সেবামূলক কার্যক্রম এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
বর্ষায় বা বছরের যেকোনো সময়ে কোনো রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়লেই স্থানীয়রা তাঁকে খবর দেন। আর খবর পাওয়া মাত্রই তাঁর নিজস্ব ইটভাটা থেকে পৌঁছে যায় ইটের গাড়ি। এমনকি মানুষের জরুরি প্রয়োজনে যেকোনো সময় রাস্তায় ফেলার জন্য তাঁর ইটভাটায় সবসময় আলাদাভাবে ভাঙা ইট (রাবিশ) জমিয়ে রাখা হয়।
চেয়ারম্যানের সন্তান হিসেবে বাবার জনকল্যাণমূলক কাজের ধারাকে বজায় রেখে আব্দুস ছাত্তার সিকদার এলাকায় একজন পরিচিত সমাজসেবক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। সরকারি বরাদ্দের আশায় বসে না থেকে একজন সাধারণ নাগরিকও যে নিজের উদ্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন, তাঁর কর্মকাণ্ডে এর উদাহরণ পাওয়া যায়। তাঁর এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
ওই ইউনিয়নের দিঘুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা খলিলুর রহমান, আরশেদ আলী, কোরবান আলী, গৃহবধূ নাজমেআরা বেগম, মর্জিনা আক্তারসহ অনেকেই জানান, গ্রামীণ উন্নয়নে সরকারি বরাদ্দ থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। এমন বাস্তবতায় জনপ্রতিনিধি না হয়েও নিজের অর্থ ব্যয় করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোয় ছাত্তার সিকদার এলাকায় পরিচিতি পেয়েছেন। শুধু রাস্তা সংস্কারই নয়, এলাকার মানুষের বিপদে-আপদেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন তিনি।
বহুরিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আলহাজ হোসাইন বলেন, ‘দক্ষিণ মির্জাপুরে, বিশেষ করে বহুরিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ আমলে কোনো উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড হয়নি। যা বরাদ্দ এসেছে, তা হরিলুট করে ভাগ-বাটোয়ারা করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পকেট ভারী করেছেন। ছাত্তার নিজস্ব অর্থায়নে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করে যাচ্ছেন।’
মির্জাপুর উপজেলা বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আব্দুস ছাত্তার সিকদার জানান, নিজের জায়গা থেকে যতটুকু সম্ভব মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন তিনি। তিনি আরো বলেন, ‘তিন বছর ধরে এভাবেই কাজ করে যাচ্ছি। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এলাকার মানুষ চাইলে এবং দলীয় মনোনয়ন পেলে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে। তবে নির্বাচনে অংশ নিই বা না নিই, মানুষের সেবা করা অব্যাহত থাকবে।’
মির্জাপুর উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মো. জালাল উদ্দিন খান জানান, তিনি মির্জাপুরে নতুন যোগদান করেছেন। বহুরিয়া ইউনিয়নের ছাত্তার সিকদারের সমাজসেবামূলক কাজ দেখে তিনি খুশি। সবাই যদি যার যার জায়গা থেকে সড়ক ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণে সচেতন হন, তাহলে সড়কের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পাবে এবং জনসাধারণ সুবিধা পাবেন।
টাঙ্গাইল এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জাহানারা পারভীন জানান, গ্রামীণ সড়কগুলো সচল রাখা এবং জনগণের চলাচলের দুর্ভোগ লাঘবে সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি বা সামাজিক উদ্যোগ সব সময়ই প্রশংসনীয়। আব্দুস ছাত্তার সিকদার জনপ্রতিনিধি না হয়েও সড়ক উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে যেভাবে অবদান রাখছেন, তা একটি দৃষ্টান্ত। তাঁর এই উদ্যোগ এলজিইডির গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে আরও ত্বরান্বিত করবে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তাঁর এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।
