মির্জাপুরে শিশু হাফিজা হত্যার পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও মামলার অগ্রগতি নেই

অপরাধ আইন আদালত দুর্ঘটনা মিডিয়া মির্জাপুর

মির্জাপুর প্রতিনিধি: মির্জাপুরে শিশু হাফিজা হত্যার পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও মামলার অগ্রগতি না হওয়ায় এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী শিশু হাফিজার পিতা সোহেল মিয়া।

 

মির্জাপুর প্রেসক্লাবে এসে সাংবাদিকদের কাছে এই ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি তার শিশুকন্যা হত্যার দ্রুত বিচার করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুদৃষ্টি ও হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এ সময় হাফিজার মা চায়না বেগম উপস্থিত ছিলেন।

 

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি তালাবদ্ধ একটি ঘর থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় হাফিজা আক্তার (৭) নামে প্রথম শ্রেণির এক ছাত্রীর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। হাফিজা উপজেলার উয়ার্শী ইউনিয়নের বরটিয়া গ্রামের সোহেল মিয়ার মেয়ে। তিনি দেওহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী। হাফিজার গার্মেন্টস কর্মী বাবা সোহেল মিয়া পরিবার নিয়ে কদিম দেওহাটা গ্রামের মাজাহারুলের ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।

পরিবারের লোকজন জানান, গত ৭ ফেব্রুয়ারি দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে খেলাধুলার জন্য বাড়ির সামনে মাঠে যাবার পর নিখোঁজ হয়। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। নিখোঁজের সাত দিন পর শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে কদিম দেওহাটা এলাকায় বদর মিয়ার ভাড়া বাসার আশপাশে দুর্গন্ধ ছড়ালে স্থানীয় লোকজন খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন। ওমর ফারুক নামে এক ব্যক্তির তালাবদ্ধ ঘরের ভেতর থেকে হাত-পা বাঁধা ও বিবস্ত্র অর্ধগলিত লাশ দেখতে পান। পরে পরিবারের লোকজন হাফিজার পরিচয় নিশ্চিত করেন। খবর পেয়ে মির্জাপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল শেষে লাশ উদ্ধার করেন।

এ সময় দেওহাটা ফাঁড়ির এসআই নিখোঁজ অভিযোগের তদন্তকারী কর্মকর্তা নুরনবী ঘটনাস্থলে গেলে পরিবারের সদস্য ছাড়াও স্থানীয় লোকজনের তোপের মুখে পড়েন। পরে কয়েকজনের সহযোগিতায় নুরনবী নিরাপদে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

শিশু হাফিজার বাবা সোহেল অভিযোগ করেন, তার শিশু মেয়েকে না পেয়ে দেওহাটা পুলিশ ফাঁড়িতে গেলে কর্তব্যরত এসআই নুরনবীকে বিষয়টি অবহিত করেন। ওই সময় তিনি বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ এবং বিভিন্ন বাজে মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ হাফিজার পরিবারের সদস্যদের। তিনি কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় ওই দিন রাতে (৭ ফেব্রুয়ারি) থানায় ডায়েরি করেন। পরের দিন ৮ ফেব্রুয়ারি একটি অচেনা নাম্বার থেকে ফোন আসে এবং তাদের কাছে শিশুটি আছে বলে জানায় এবং ৬০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। সন্তান পাওয়ার আশায় চার হাজার টাকাও পাঠান হাফিজার বাবা। বাকি টাকা চেয়ে ফোন কেটে দেন। বিষয়গুলো এসআই নুরনবীকে অবহিত করলেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। পরে স্থানীয় লোকজন ফাঁদ পাতেন।

মুক্তিপণের টাকা দেওয়া হবে বলে দুর্বৃত্তরা গোড়াই ও ক্যাডেট কলেজ গেটসহ বিভিন্ন স্থানের ঠিকানা দেন। সর্বশেষ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের উপজেলা সদরের মা সিএনজি স্টেশনের ঠিকানা দেন। মুক্তিপণের টাকা দিতে এসে সন্ধ্যায় স্থানীয় লোকজন উপজেলার গোড়াই ইউনিয়নের বাইমাইল গ্রামের জালাল সিকদারের ছেলে সাজিদ সিকদারকে (১৭) আটক করেন।

এ সময় সাজিদের পকেট থেকে মেয়েদের চুলের ক্লিপ উদ্ধার করেন। পরে ক্লিপসহ সাজিদকে এসআই নুরনবী ও কবীরুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করেন। এ ঘটনায় শিশু হাফিজার বাবা সোহেল মিয়া ১০ ফেব্রুয়ারি মির্জাপুর থানায় মামলা করেন। পরিবারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন করে এসআই শামীম আহমেদকে দেওয়া হয়। তার কার্যক্রমও ধীরগতি বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।

সোহেল মিয়া বলেন, ঢাকায় রামিসা নামের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। আমদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাসায় গিয়ে হত্যার বিচারের আশ্বাস দেন; কিন্তু আমার মেয়ে হত্যার পাঁচ মাস পার হলেও পুলিশের কোনো তৎপরতা পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া ময়নাতদন্তের রিপোর্টও থানায় আসেনি বলে জানান তিনি। তাছাড়া পুলিশ এখন পর্যন্ত ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেননি।

তিনি আরও বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তখন আমি প্রাণ ফিরে পেয়েছিলাম। আমার মেয়ের বিচার হবে; কিন্তু কোনো আসামিকেই পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেননি।

হাফিজার মা চায়না বেগম অভিযোগ করেন, মেয়ে নিখোঁজের এক সপ্তাহেও পুলিশ ঘটনাস্থলে আসেননি। তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ ব্যবস্থা নিলে আমার মেয়েকে উদ্ধার করা সম্ভব হতো। পরিবারের পক্ষ থেকে অপরাধীদের সঙ্গে এসআই নুরনবীরও শাস্তি দাবি করেন। হাফিজার মা আরও অভিযোগ করেন, একটি মৃত মানুষের রিপোর্ট আসতে পাঁচ মাসের বেশি সময় লাগলে সেই পরিবার বিচার পাবে কবে?

এ প্রসঙ্গে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মির্জাপুর থানার এসআই শামীম আহমেদ বলেন, মহাখালী থেকে ভিসেরা এবং টাঙ্গাইল থেকে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসেনি। হাফিজার খুনের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে জনতার আতে আটক বর্তমানে টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে থাকা সাজিদকে তিন দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তিনি কোনো তথ্য দিতে পারেনি। হাফিজার খবর দিতে পারলে পুরস্কার দেওয়া হবে এমন তথ্য ফেসবুকে দেখে সে ফোন করেছিল বলে জানিয়েছে। তিনি আরো জানান, তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আসামিদের চিহ্নিত এবং গ্রেফতারে পুলিশ কাজ করছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *