ভূঞাপুরে বিএনপি নেতার বিদ্যালয়ে না গিয়েও ২৩ বছর ধরে বেতন উত্তোলন

অপরাধ দুর্নীতি প্রতিষ্ঠান ভূঞাপুর শিক্ষা

ভূঞাপুর প্রতিনিধি: ভূঞাপুর উপজেলার তালুকদার সিরাজ আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেলিমুজ্জান সেলুর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেও বেতন গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে।

 

স্থানীয়দের দাবি, তিনি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিত না থেকেও প্রায় ২৩ বছর ধরে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি দলীয় প্রভাব খাটিয়ে নিজ বাসা থেকেই বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

 

জানা যায়, ১৯৯৫ সালে জানুয়ারি মাসে প্রতিষ্ঠিত হয় তালুকদার সিরাজ আলী উচ্চ বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান ভূঞাপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেলিমুজ্জান সেলু। ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হয়।

তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে সেলু নিয়মিত বিদ্যালয়ে যান না। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ম্যানেজ করে নিয়মিত বেতন উত্তোলন করতেন বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। তার বড় ভাই শাহ আলম তালুকদার দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সেলিমুজ্জান সেলু ২০০৩ সালে উপজেলা বিএনপির যুব বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে তিনি যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত সেলু উপজেলা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।

স্থানীয়রা জানান, সরকার পতনের পর ২০২৪ সালে ৭ সেপ্টেম্বর প্রভাব খাটিয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির অ্যাডহক কমিটি গঠন করেন সেলিমুজ্জান সেলু। তিনি ছয় মাসের জন্য সভাপতি নির্বাচিত হন। ছয় মাসের মধ্যে কমিটির নির্বাচন দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি দেননি। পরবর্তীতে অ্যাডহক কমিটির মেয়াদ বাড়ানো হয়। এরপর থেকে নির্বাচন না দিয়েই এক বছর ৮ মাসের বেশি সময় ধরে সেলু কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

সেলিমুজ্জান সেলু একাধারে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, তালুকদার সিরাজ আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত খসড়া আচরণবিধি অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষক-কর্মচারী প্রত্যক্ষভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে, রাজনৈতিক পদ গ্রহণ করতে বা রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নিতে পারবেন না। যদি কোনো প্রধান শিক্ষক সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হন বা নির্বাচনি কার্যক্রমে অংশ নেন, তাহলে তা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার অধীনে অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে। এ অপরাধে চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অপসারণের মতো কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে পারেন। কিন্তু সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করেই উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেলিমুজ্জান সেলু প্রধান শিক্ষকদের দায়িত্ব পালন করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক বলেন, বিশেষ প্রোগ্রাম ছাড়া সেলিমুজ্জান সেলু বিদ্যালয়ে আসেন না। বিদ্যালয়ের যত দাপ্তরিক কাজ আছে তার বাসা থেকেই করেন।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) শহিদুল ইসলাম বলেন, সেলিমুজ্জান সেলু বিগত সরকারের আমলেও প্রধান শিক্ষক ছিলেন। বর্তমান সরকারের আমলেও প্রধান শিক্ষকদের দায়িত্ব পালন করছেন। ঈদের ছুটিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় মাত্র খুলেছে। বিষয়টি নিয়ে একাডেমি সুপারভাইজারকে পরিদর্শন করতে বলেছি। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম মোস্তফা বলেন, যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান যদি দলের নেতাও হন, তবু তাকে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে। আর যদি দায়িত্ব পালন না করেন, তবে সেই দায়ভার দল নেবে না।

মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির জেলা শাখার একাংশের সভাপতি আব্দুল কাদের বলেন, ভূঞাপুর অ্যাডহক কমিটি করতে তিনি আমাদের কাছে কোনো অনুমোদন নেননি।

মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির জেলা শাখার আরেক অংশের সভাপতি শামিম আল মামুন জুয়েল বলেন, প্রথম পর্যায়ে ছয় মাসের জন্য অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তী সময়ে নির্বাচন করতে না পারায় আবারও কমিটির মেয়াদ বাড়ানো হয় কিন্তু কেনো নির্বাচন হয়নি।

উপরোক্ত অভিযোগের বিষয়ে সেলিমুজ্জামান সেলু জানান, আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। কমিটির ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি সরাসরি এসে কথা বলতে বলেন।

টাঙ্গাইল জেলা শিক্ষা অফিসার রেবেকা সুলতানা বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হলাম। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *