সন্তোষের মুসাফিরখানা: বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া চলছে প্রায় ৮০ বছর!

ইতিহাস ও ঐতিহ্য টাঙ্গাইল সদর প্রতিষ্ঠান ফিচার

নিজস্ব প্রতিবেদক: মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মুসাফিরখানায় ভক্তানুসারী ও দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলছে। মওলানা ভাসানীর মানবসেবার আদর্শ নিয়ে প্রায় ৮০ বছর ধরে এখানে বিনা মূল্যে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সময়ের পরিবর্তন, সমাজের নানা সংকট আর মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এলেও এখানে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থায় কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি।

 

সন্তোষে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর স্মৃতিবিজড়িত এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে রয়েছে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও জনকল্যাণের এক দীর্ঘ ইতিহাস। দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষ, দরিদ্র পথচারী কিংবা প্রয়োজনের তাগিদে আশ্রয় খোঁজা মানুষের জন্য বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক উদ্যোগ।

 

মওলানা ভাসানী রাজনীতির মাঠে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। তিনি কৃষক, শ্রমিক ও নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ে আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তার জীবনদর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ। মানুষের ক্ষুধা, দুঃখ ও অসহায়ত্বকে গুরুত্ব দেওয়ার সেই আদর্শই মুসাফিরখানার এই উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মওলানা ভাসানীর জীবনের নানা ঘটনা ও স্মৃতিচারণেও মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। দূর থেকে কেউ তার কাছে এলে অতিথির খাবার ও প্রয়োজনের কথা তিনি ভাবতেন— এমন বর্ণনাও বিভিন্ন লেখায় পাওয়া যায়। ফলে মুসাফিরখানার বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা কেবল একটি সেবামূলক উদ্যোগ নয়; এটি তার মানবিক আদর্শের স্মারক হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, মওলানা ভাসানীর স্মৃতিবিজড়িত এই মানবিক উদ্যোগের ইতিহাস যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে আর্থিক অসচ্ছলতা কিংবা দূরপথের যাত্রায় বিপাকে পড়া মানুষ এখানে এসে আশ্রয় ও খাবার পাওয়ার সুযোগ পান।

মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক সংগ্রাম ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আর মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এমন উদ্যোগ তার মানবিক দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করে। প্রায় ৮০ বছরের এই সেবার ইতিহাস সঠিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সংরক্ষিত হলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হয়ে উঠতে পারে মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক মূল্যবান শিক্ষা।

ভারতের আসামের লক্ষিপুরের গোয়ালপাড়া থেকে তিন ব্যবসায়ী ভাসানীর মুসাফিরখানায় এসেছেন। এদের মধ্যে মনিরুজ্জামান বলেন, আমাদের বাপ-দাদারা ভাসানী হুজুরের শিষ্য ছিলেন। তাদের কাছ থেকে ভাসানী হুজুর সম্পর্কে অনেক কথা জেনেছি। আজ স্বশরীরে সন্তোষে এসেছি। মুসাফিরখানায় উঠে অনেক সেবা-যত্ন পেয়েছি। টাঙ্গাইলে এসে আমাদের ভালোই লাগছে।

সানিদুল ইসলাম বলেন, আমরা এসেই হুজুরের মাজার জিয়ারত করেছি। বাবা-মায়ের কাছে ভাসানীর ইতিহাস সম্পর্কে জেনেছি। ইতঃপূর্বে শুনেছি, ভাসানীর প্রতিষ্ঠিত মুসাফিরখানায় থাকা-খাওয়া ফ্রি। আজ এসে সেটার প্রমাণ পেলাম।

মুসাফিরখানায় দায়িত্বে থাকা আমেনা বেগম বলেন, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ভক্তানুসারীরা এখানে আসেন। তারা ভাসানীর মাজারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন। আমরা তাদের খাবারের সেবায় নিয়োজিত থাকি। অনেকেই বাজার করে নিয়ে আসেন, আবার অনেকেই বাজার ছাড়া আসেন। যারাই এখানে আসেন, তাদের আমরা সাধ্যমতো খাবার দিয়ে থাকি।

মুসাফিরখানায় রান্নার দায়িত্বে থাকা চান মিয়া বলেন, আমি প্রায় ৬০ বছর যাবৎ এই মুসাফিরখানায় রান্না করে থাকি। প্রতি বৃহস্পতিবার এখানে অনুষ্ঠান হয়। এ ছাড়া প্রতি চাঁদের ১১ তারিখও অনুষ্ঠান হয়। এসব অনুষ্ঠানে দূরদূরান্তের ভক্তরা আসেন। প্রতিদিনই দুই বেলা করে খাবার দেওয়া হয়। যারাই আসেন, তাদের জন্যই এখানে ফ্রিতে থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে।

মওলানা ভাসানীর দৌহিত্র ও ন্যাপ ভাসানীর সভাপতি হাসরত খান ভাসানী বলেন, ১৯৪৬ সাল থেকে মুসাফিরখানা মওলানা ভাসানী হুজুর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তারপর থেকে প্রায় ৮০ বছর যাবৎ এ কার্যক্রম অব্যাহত আছে। হুজুরের মুরিদান ও মুসাফিরখানায় আগতদের সহযোগিতায় এ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। মওলানা ভাসানী হুজুর একটা কথা বলতেন, তার দরগায় কেউ আসলে তাকে একটি রুটি দাও। যে কারণে এখানে কেউ আসলে না খেয়ে যেতে পারেন না। আল্লাহর রহমতে ভবিষ্যতেও এ কার্যক্রম চলমান থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *