
নিজস্ব প্রতিবেদক: চলতি মৌসুমে অনুকূল আবহাওয়া থাকলেও ফসল পরিপক্ব হওয়ার আগমুহূর্তে অজ্ঞাত ভাইরাসজনিত রোগের আক্রমণে সেই আশা এখন হতাশায় পরিণত হয়েছে। কৃষকরা আখের বাম্পার ফলনের আশা করলেও জেলার বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেতের পর ক্ষেত আখ পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় তুলতে না পেরে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন আখচাষিরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে টাঙ্গাইল জেলায় প্রায় ৪৬৫ হেক্টর জমিতে আখের চাষ হয়েছে। তবে অজ্ঞাত ভাইরাসের কারণে আখের কাণ্ডে পচন ধরছে। যেসব আখ এখনো টিকে আছে, সেগুলোরও কাঙ্ক্ষিত বৃদ্ধি হয়নি। বর্তমানে বাজারে প্রতি পিস আখ সর্বোচ্চ ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ গত বছর একই আখ ৩০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় প্রতি পিস আখে প্রায় ৩০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।
সরেজমিনে সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, সবুজ আখের ক্ষেত এখন ভাইরাসের আক্রমণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বছরের প্রধান আয়ের উৎস হারিয়ে হতাশায় দিন কাটছে কৃষকদের। ক্ষতিগ্রস্তরা দ্রুত সরকারি সহায়তা, কৃষি বিভাগের কার্যকর পদক্ষেপ এবং কৃষক কার্ডের মাধ্যমে অনুদান বা ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, মৌসুমের শুরুতে আখের বৃদ্ধি ভালো ছিল। ফলে ভালো ফলনের আশা করেছিলেন তারা। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে অজ্ঞাত ভাইরাসের সংক্রমণে একের পর এক আখ পচে যেতে শুরু করে। বিশেষ করে ঈশ্বরদী জাতের ‘পচাদানা’ আখ সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে। অনেক জমিতে একটি আখও সুস্থ নেই।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সুলতান কবির বলেন, সময়মতো রোগ দমনে কার্যকর ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ না পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বিষয়টি কৃষি বিভাগকে জানানো হলেও মাঠপর্যায়ে তেমন সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।
আরেক কৃষক রমজান আলী বলেন, ভালো ফলনের আশা করেছিলেন। কিন্তু অজ্ঞাত ভাইরাসে সব শেষ হয়ে গেছে। অনেকের পুরো ক্ষেতই পচে গেছে। আখ বিক্রির টাকা দিয়ে সংসার চালানোর পরিকল্পনা ছিল। এ ছাড়া আখ চাষের জন্য অনেকের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন। এখন সেই ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
কৃষক শফিক আহমেদ বলেন, ঈশ্বরদী জাতের আখ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টি কৃষি বিভাগকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে না দাঁড়ালে তারা বড় সংকটে পড়বেন।
সদর উপজেলার খারজানা গ্রামের কৃষক আবু হানিফ জানান, তিনি ১০ শতাংশ জমিতে আখ চাষ করেছেন। এতে প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আখগুলো ভালোভাবে মোটা হলে অন্তত খরচের টাকা উঠে আসত। কিন্তু ভাইরাসের কারণে সব নষ্ট হয়ে গেছে। এখন যা আছে, তা বিক্রি করে হয়তো ১০ হাজার টাকা পাওয়া যাবে। তবে বিক্রির জন্যও অতিরিক্ত খরচ রয়েছে।
পাকুল্ল্যা এলাকার কৃষক দবির উদ্দিন জানান, গত বছর ৩৩ শতাংশ জমিতে আখ চাষে প্রায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছিল। বিক্রি করে আয় হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। তখন তার বাগানে প্রায় ২ হাজার ৪০০টি আখ ছিল। অথচ এবার একই বাগানে ভাইরাসের আক্রমণে আখের সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ১ হাজার ২০০টিতে। এতে লোকসানের আশঙ্কাই বেশি।
কৃষক মাহমুদ আলী জানান, তিনি প্রায় ১৫০ শতাংশ জমিতে আখের চাষ করেছেন। উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় লাভ তো দূরের কথা, মূলধন ফেরত পাবেন কি না, তা নিয়েই শঙ্কায় রয়েছেন। অধিকাংশ আখে পচন ধরেছে। বাগানের মাঝামাঝি কিছু আখ টিকে থাকলেও সেগুলোও প্রত্যাশিত আকার ধারণ করেনি।
টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক শোয়েব মাহমুদ বলেন, জেলার কয়েকটি এলাকায় আখে ভাইরাসজনিত সমস্যার তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখছেন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আক্রান্তের মাত্রা ও কারণ নির্ণয়ের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
