দেলদুয়ারে ইউএনও’র বিরুদ্ধে নির্বাচনি বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

অপরাধ আইন আদালত দুর্নীতি দেলদুয়ার নির্বাচন

দেলদুয়ার প্রতিনিধি: দেলদুয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জোহরা সুলতানা যূথির বিরুদ্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (ভোট ও গণভোট) পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশনের দেওয়া বরাদ্দের অর্থ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে।

 

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেয় নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনকালীন ব্যয়ের জন্য সে সময় বরাদ্দের সম্পূর্ণ অর্থই উত্তোলন করা হয়। তবে কমিশন নির্ধারিত খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় না করেও ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে কাগজে-কলমে সম্পূর্ণ অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে।

 

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সময়ের তিন ধাপে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ১৬টি ভোট কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য পাঁচ লাখ ২৪ হাজার ৮০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এছাড়া সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও তার দপ্তরের নির্বাচনি কার্যক্রম, ফলাফল সংগ্রহ, কন্ট্রোল রুমসহ অন্যান্য কমিটির আপ্যায়ন বাবদ ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা, বিভিন্ন স্টেশনারি ক্রয় বাবদ এক লাখ ৬০ হাজার টাকা, সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও তার দপ্তরের নির্বাচনি কার্যক্রমের জন্য পিওএল, স্পিডবোট, জলযান, ট্রলার, ট্যাক্সি ও ভ্যান ভাড়া বাবদ ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা এবং সহকারী রিটার্নিং অফিসে ২ মাসের জন্য একজন খণ্ডকালীন করণিকের সম্মানী ভাতা ৩৬ হাজার টাকা ও একজন পিয়নের সম্মানী ভাতা ২৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

নির্বাচনকালীন সময়ে একদিনে এত পরিমাণ যাতায়াত না হলেও ভুয়া ভাউচার জমা দিয়ে বরাদ্দের সম্পূর্ণ অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে। এছাড়া ইউএনওর ব্যবহৃত গাড়ির জ্বালানি বাবদ নিয়মিত সরকারি মাসিক বরাদ্দের তেলও ব্যবহার দেখিয়েছেন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা।

জানা যায়, দেলদুয়ার উপজেলায় নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহ ও দ্রুত তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানানোর জন্য একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (কন্ট্রোল রুম) স্থাপন করা হয়। ওই কন্ট্রোল রুমে উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়িত্ব পালন করেন।

নির্বাচনের আগের দিন থেকে নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত কন্ট্রোল রুমে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আপ্যায়ন বাবদ কমিশন থেকে দুই ধাপে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অথচ এক বোতল পানিও খেতে দেওয়া হয়নি বলে জানান কন্ট্রোল রুমে দায়িত্বে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের দাবি, আপ্যায়নের জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা পুরোপুরি সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা আত্মসাৎ করেছেন।

এছাড়া নির্বাচনকালীন সময়ে দুই মাসের জন্য সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে একজন খণ্ডকালীন করণিক ও একজন পিয়ন নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও তাদের জন্য বরাদ্দকৃত ৬৪ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে খণ্ডকালীন করণিক ও পিয়ন জেলার কোনো উপজেলাতেই নিয়োগ দেওয়া হয়নি। সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দাবি, এই ধরনের কোনো বরাদ্দই তারা পাননি।

কন্ট্রোল রুমে দায়িত্বে থাকা একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, টানা তিনদিন নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করেছেন তারা। কিন্তু এই তিনদিন তাদের চা-নাস্তা তো দূরের কথা, এক বোতল পানিও দেওয়া হয়নি। সবাইকে নিজের পকেটের টাকা খরচ করে খেতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের জন্যও নিজেদের টাকা খরচ করতে হয়েছে।

ভোটকেন্দ্রে মালামাল আনা-নেওয়ার কাজে নিয়োজিত একাধিক গাড়িচালক জানান, নির্বাচনে এসব পরিবহন সংক্রান্ত সব বিষয় দেখভাল করেছে থানা পুলিশ। তবে তাদের কাউকে খাওয়ার জন্য এক হাজার টাকা করে এবং দূরত্ব অনুযায়ী গাড়িতে জ্বালানি দেওয়া হয়েছে ইউএনও কার্যালয়ের টোকেনের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট তেলের পাম্প থেকে।

দেলদুয়ার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাখাওয়াত হোসেন জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইউএনও’র নির্দেশে ৫৭টি কেন্দ্রে ছোট-বড় মিলিয়ে ৫৭টি ট্রাক এবং ম্যাজিস্ট্রেটদের ব্যবহারের জন্য ১৫টি হাইয়েস গাড়ি দেওয়া হয়েছিল। এসবের জন্য ইউএনও অফিস থেকে দূরত্ব অনুযায়ী জ্বালানি এবং চালকদের খাওয়ার টাকা দেওয়া হয়েছে।

দেলদুয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাচনকালীন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা যূথি বলেন, ‘নির্বাচনকালীন সময় খণ্ডকালীন দুই মাসের জন্য একজন করণিক ও একজন পিয়ন নিয়োগের জন্য নির্বাচন কমিশন থেকে কোনো বরাদ্দ পাইনি, তাই তিনি নিয়োগ দেননি। আরও কিছু জানার থাকলে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে পারেন।’

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সঞ্জয় কুমার মোহন্ত জানান, এ ধরনের কোনো অনিয়মের অভিযোগ তিনি পাননি। বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া, কেউ কেউ অবশিষ্ট টাকা নির্বাচন কমিশনে চেকের মাধ্যমে ফেরত দিয়েছেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *