টাঙ্গাইল পৌরসভার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ!

অপরাধ টাঙ্গাইল সদর দুর্নীতি প্রতিষ্ঠান

নিজস্ব প্রতিবেদক: টাঙ্গাইল পৌরসভার অবকাঠামো উন্নয়নের প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে বলে জানা গেছে। টাঙ্গাইল পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মোঃ মনিরুল ইসলাম ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মোঃ জাবেদুল ইসলাম এবং স্থানীয় ঠিকাদার মের্সাস কাওছার আকবারের স্বত্বাধিকারী কাওছার আকবার আরিফের বিরুদ্ধে প্রকল্পের ৭ লাখ ৪৩ হাজার ১০০ টাকার কাজে এ অভিযোগ ওঠে।

টাঙ্গাইল পৌরসভা দেশের প্রাচীন পৌরসভার একটি। ১৮৮৭ সালের ১ জুলাই এই পৌরসভাটি প্রতিষ্ঠা লাভের পর ১৯৮৫ সালে টাঙ্গাইল পৌরসভা ‘গ’ থেকে ‘খ’ এবং ১৯৮৯ সালে ‘খ’ থেকে ‘ক’ শ্রেণীতে উন্নতি লাভ করে।

 

জানা গেছে, টাঙ্গাইল পৌরসভার রাজস্ব তহবিলের আওয়ায় (নিজস্ব উন্নয়ন) ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে টাঙ্গাইল পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ডের আমতলী মোড় হতে টাঙ্গাইল জেলা সদর দপ্তর থেকে পুলিশ লাইন্স স্কুল হয়ে জেলগেট পর্যন্ত ১৫০ ওয়াড এলইডি ৬০টি স্ট্রিটলাইট স্থাপনে টাঙ্গাইল অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় টাঙ্গাইল পৌরসভার জন্য ৭ লাখ ৪৩ হাজার ১০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কার্যদেশ পায় মের্সাস কাওছার আকবার নামে স্থানীয় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। চলতি বছর ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ হতে ৩০ মার্চ ২০২৬ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদিত হয়। কাজের মেয়াদ শেষ করে পুরো বিল তুলে নেয় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান।

 

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কাজের মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মাথায় ৬০টি স্ট্রিট লাইটের মধ্যে অধিকাংশ লাইট নষ্ট । এ বিষয়ে জানতে চাইলে পৌর কর্তৃপক্ষ জানায়, যে লাইটগুলো নষ্ট তা পুনরায় লাগানো হবে। অভিযোগ উঠেছে, টাঙ্গাইল পৌরসভার নোটশীটে টাঙ্গাইল পৌরসভা রাজস্ব তহবিলের আওয়ায় (নিজস্ব উন্নয়ন) বর্ণিত কাজ বাস্তবায়নের জন্য পৌর পরিষদের ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ সালে সাধারণ সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং প্রাক্কলিত অর্থ ৭ লক্ষ ৪৩ হাজার ৪০০ টাকা অনুমোদিত হয়। এখনও ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাস না আসলেও সাধারণ সভার আহবান করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, ১৫০ ওয়াডে এলইডি স্ট্রিট লাইট সরকারী আইটেম কোড অনুয়ায়ী ৭ হাজার টাকা মূল্য নিধারণ করা হলেও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫ (পিপিআর) আইন না মেনে তা পরবর্তীতে ১২ হাজার ৩৯০ টাকামূল্য নিধারণ করে কোটেশন দেয় পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মোঃ মনিরুল ইসলাম।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে ইস্টটিমেট আইটেম কোড এর স্থানে রেটসিডিঊলে নিয়ম বহিভূতভাবে আইটেম কোড না বসিয়ে সে স্থানে স্ট্রিট লাইট লিখে ইচ্ছেমত রেট বসিয়ে দরপত্র আহবান করা হয়। নিয়ম অনুয়ায়ী বর্তমান বাজার দর অনুয়ায়ী যদি পণ্যের দাম বেশি হয় তাহলে সিডিউল অব রেট ২০২৫ অনুয়ায়ী টাঙ্গাইল পৌরসভা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প মেক রেট এনালাইসিস কমিটির সভায় অনুমোদনের প্রয়োজন হলেও এক্ষেত্রে কোন নিয়ম মানা হয়নি।

টাঙ্গাইল পৌরসভার প্রশাসক শিহাব রায়হান বদলি হলে নতুন প্রশাসক নিয়োগের পর সুযোগ নিয়ে পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী স্বল্প পরিচিত পত্রিকায় দরপত্র আহ্বান করেন এবং প্রক্রিয়াটি গোপনে সম্পন্ন করেন। প্রকল্পের কাজের প্রাক্কলিত ব্যয়ের পরিমাণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকায় ইজিপি দরপত্র প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা তৈরি হয় বলে দাবি স্থানীয় ঠিকাদারদের।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দুপুর ১২ টায় চে’ পদ্ধতিতে সংক্রিয়ভাবে ওপেন হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রাপ্ত দরপত্রে দাখিলকৃত সকল কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়। সর্বনিম্ন দরপত্রদাতার দাখিলকৃত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে Post Qualification করা হয় এবং Tesden Evaluation Report প্রস্তুত করা হয়। উপর্যুক্ত কাজ বাস্তবায়নের জন্য ৬-০ পদ্ধতিতে কোটেশন দরপত্র আহবানের জন্য নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ না করে Annual Procurement Plan (APT) প্রস্তুত করে অনুমোদন গ্রহণ করা হয়। APP ID: 222937, APP Code Tangail Pourashava/REV/২০২৫-২৬ -GI’ পদ্ধতিতে দরপত্র আহবানের জন্য যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তপশীল অনুযায়ী দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রস্তুত করা হয়। প্যাকেজ TAN/POU/2025-26/RPQ-05 Tender ID: ১২২৪৪৭৪ তফসীল অনুযায়ী বর্ণিত প্যাকেজের জন্য কোটেশন দরপত্র (III) পদ্ধতিতে ০৫ (পাঁচ)টি প্রতিষ্ঠানে দর দেওয়ার জন্য অনুরোধ প্রেরণ করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেন, সহকারী প্রকৌশলী তার পছন্দের ঠিকাদারকে প্রাক্কলিত টাকার তথ্য জানিয়ে দেন। ফলে ০.০৪১ শতাংশ কম দর দেখিয়ে প্যাকেজের কাজ পেয়ে যায় মের্সাস কাওছার আকবার। কাজের মেয়াদ শেষ না হতে প্রায় অধিকাংশ লাইট নষ্ট হলেও পরিদর্শন না করেই পুরো বিল দেয় পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মোঃ মনিরুল ইসলাম ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মোঃ জাবেদুল ইসলাম।

অভিযোগে জানা যায়, সাবেক পৌর প্রশাসক শিহাব রায়হানের সময় বিভিন্ন জটিলতার কারণে অনেক কাজের বিল আটকে গেলে এবং নির্বাহী প্রকৌশলীর অসুস্থতার সুযোগের কারণে সহকারী প্রকৌশলী মোঃ মনিরুল ইসলাম নতুন প্রশাসক নিয়োগের পর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে সমন্নয় করে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ৫-১০ শতাংশ কমিশনে বিল পাইয়ে দিয়েছেন।

উপ-সহকারী প্রকৌশলী মামুনুর রশীদ-এর বদলিজনিত কারণে আরেকজন উপ-সহকারী প্রকৌশলী শামীম আল মামুন (সিভিল) থাকা সত্ত্বেও নিয়ম বহিভূতভাবে উপ-সহকারী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মোঃ জাবেদুল ইসলামকে সিভিল কাজের দায়িত্ব পাইয়ে দিয়েছেন সহকারী প্রকৌশলী মোঃ মনিরুল ইসলাম। উপ-সহকারী প্রকৌশলী শামীম আল মামুন অসুস্থ থাকায় ঠিকাদারদের ম্যানেজ না করতে পারায় তার পরামর্শে জাবেদুল ইসলামকে (যান্ত্রিক) থেকে সিভিলের দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে জানা যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী বলেন, পৌরসভার প্রকৌশলী দপ্তরের সবাই চরম দুর্নীতিবাজ। বিশেষকরে সহকারী প্রকৌশলী মোঃ মনিরুল ইসলাম, উপ-সহকারী প্রকৌশলী শামীম আল মামুন ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মোঃ জাবেদুল ইসলাম। পৌর প্রশাসক শিহাব রায়হান স্যার চলে যাওয়ার পর থেকে এই তিনজন মিলে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের কমিশন না দিলে কোন ফাইল ছাড়া হয় না।

ঠিকাদার মের্সাস কাওছার আকবারের স্বত্ত্বাধিকার আরিফ বলেন, আমি বাহিরে আছি পেপার না দেখে বলা যাবে না। আগামীকাল আমাকে কল দেন। পরের দিন মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে বলে আমি অসুস্থ এতোকিছু বলতে পারবো না।

এ বিষয়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাবেদুল ইসলাম (যান্ত্রিক) বলেন, আপনি সহকারী প্রকৌশলী মোঃ মমিরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করেন। টাঙ্গাইল পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মোঃ মনিরুল ইসলাম বলেন, আপনার যদি বেশি প্রয়োজন থাকে তাহলে তথ্য অধিকারে আবেদন করেন।

টাঙ্গাইল পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী শাজাহান আলী বলেন, আমি দীর্ঘদিন যাবত অসুস্থ। এ বিষয়ে সহকারী প্রকৌশলী মোঃ মমিরুল ইসলামের সাথে কথা বলেন। উপ-সহকারী প্রকৌশলী মামুনুর রশীদ বদলিজনিত কারণে আরেকজন উপ-সহকারী ( সিভিল) থাকা সত্ত্বেও পিপিআর বিধি মোতাবেক উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাবেদুল ইসলাম (যান্ত্রিক) সিভিলের দায়িত্ব পেতে পারে কি প্রশ্নের জবাবে বলেন সরকারী বিধি মোতাবেক হয় না তবে মেয়র বা প্রশাসক ইচ্ছে করলে এটা দিতে পারে।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইল পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আনিছুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে টাঙ্গাইল পৌরসভার প্রশাসক সঞ্জয় কুমার মহন্তের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *