
নিজস্ব প্রতিবেদক: টাঙ্গাইল ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে রোগী ও তাদের স্বজনদের জন্য বরাদ্দকৃত ১২টি লিফটের মধ্যে ৫টি বিকল থাকায় দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ক্ষেত্রে এই লিফট বিড়ম্বনা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। চিকিৎসাসেবা নিতে আসা অধিকাংশ রোগী ও তার স্বজনরা লিফটের জন্য হাসপাতালের বিভিন্ন ফ্লোরে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করছেন। লিফট বিকলের বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গণপূর্ত বিভাগের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তাদের দায় সেরেছে।
জানা যায়, ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি স্থাপিত টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবকাঠামো ও আধুনিক সুবিধার প্রত্যাশা থাকলেও হাসপাতালটির সেবা ব্যবস্থাপনায় মান নিয়েও ভুক্তভোগীদের নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। জনবল সংকট, অবকাঠামোগত সমস্যা, পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি, চিকিৎসক-স্টাফদের অনুপস্থিতি এবং লিফট বিকল থাকার মতো বিষয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে মঙ্গলবার সকাল ১১ টায় হাসপাতালে দেখা যায়, হাসপাতালের প্রথম তালায় লিফটগুলোর সামনে রোগী ও তাদের স্বজনদের দীর্ঘ লাইন। তারা জানান, ১৫ তলা হাসপাতালে বিভিন্ন ফ্লোরে যেতে লিফটের কোন বিকল্প নেই। তাই তারা মুমূর্ষ রোগী নিয়ে লিফটের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে হাসপাতালের পঞ্চম তলায় গিয়ে দেখা যায়, গুরুতর অসুস্থ্য শম্ভুনাথ পাল লিফটের জন্য অপেক্ষা করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে ফ্লোরে পড়ে রয়েছেন। স্বজনেরা তাকে খবরের কাগজ দিয়ে বাতাস করছেন। তারা জানান, শম্ভুনাথ পাল এসেছেন রেডিওলজি বিভাগে। ডাক্তার দেখানোর পর নিচ তলায় নামতে লিফটের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তারা। এমতাবস্থায় অবস্থায় তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
বহুতল হাসপাতাল ভবনে রোগী, স্বজন ও হাসপাতালের কর্মীদের জন্য লিফট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ রোগী, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী রোগী, বয়স্ক ব্যক্তি ও হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য লিফটের বিকল্প খুবই সীমিত। কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের বহুতল ভবনের বেশিরভাগ লিফট প্রায়ই নষ্ট থাকে। ফলে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তির শেষ নেই।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, বর্তমানে হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ ৭৪০ জন ডাক্তার, স্টাফ ও নার্সদের বিপরীতে মাত্র ৩২২ জন জনবল কর্মরত। ৫০০ শয্যার বিপরীতে হাসপাতালে ৮৪০ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। অতিরিক্ত রোগী ও তার স্বজনদের সামলাতে অপ্রতুল জনবল নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে ডাক্তার ও নার্সদের।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ফারুক হোসেন, আনিসুর রহমান ও সালমা বেগম জানায়, লিফটের জন্য ৩০ মিনিট ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, প্রচুর ভিড় আর লম্বা লাইন থাকায় এখনো ডাক্তার দেখাতে পারিনি। মুমূর্ষু রোগী নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক রোগীর স্বজন অভিযোগ করে বলেন, আজকে আমার মার যদি গুরুতর কোন কিছু হয় সেটা এই লিফটের কারণেই হবে। অপর একজন অসুস্থ রোগী সকাল দশটায় এসেছে লিফটে ভিড় ও লম্বা লাইন থাকায় সে বেলা দুইটার সময়ও ডাক্তার দেখাতে পারেননি।
টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. আব্দুল কুদ্দুস বলেন, হাসপাতালের ১২টি লিফটের মধ্যে বর্তমানে ৫টি লিফট বিকল রয়েছে। লিফট মেরামতের বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগকে বারবার চিঠি দেয়া সত্ত্বেও তারা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না। এছাড়া ১২টি লিফট রক্ষণাবেক্ষণ এর পুরো দায়িত্ব গণপূর্ত বিভাগের। গণপূর্ত বিভাগ ওটিজ ও ক্রিয়েটিভ এই দু’টি কোম্পানির মাধ্যমে লিফটগুলো সারাবছর রক্ষণাবেক্ষণ করিয়ে থাকে। তিনি আরও জানান, টাংগাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সমস্ত ক্রয় ইজিপি টেন্ডারের মাধ্যমে হয়, এখানে হাসপাতালে কর্তৃপক্ষের কোন হাত নেই। তিনি আরো বলেন, অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের সুপারভাইজারগণ অভিযোগগুলো মীমাংসা করে থাকেন। এছাড়া হাসপাতালে ৭৪০ জন জনবলের বিপরীতে মাত্র ৩২২ জন থাকায় সমস্যার সমাধানে কিছুটা হিমশিম খেতে হচ্ছে ।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শম্ভুনাথ পাল বলেন, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২টি লিফট স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭টি চালু আছে। ৫টি বিকল লিফট আমরা এখনো চালু করতে পারিনি। তবে আমাদের কার্যক্রম চলমান আছে। বিকল লিফটগুলোতে অনেক দামি পার্টস প্রয়োজন, যা টাঙ্গাইলে পাওয়া যায় না। ঢাকা থেকে আনতে হয়। এ বিষয়ে আমি লিফট কোম্পানিকে ইতিমধ্যে অবহিত করেছি। আমাদের রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ বাৎসরিক ব্যয় ধরা আছে মাত্র ১২ লক্ষ টাকা। এই টাকা ১২টি লিফট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিতান্তই অপ্রতুল। তবে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাকি ৫টি চালু হয়ে যাবে।
