জামুর্কী ইউনিয়নের উফুলকি ঘোষপাড়ার ঘি জৌলুস হারাতে বসেছে!

ইতিহাস ও ঐতিহ্য জাতীয় পরিবেশ মির্জাপুর স্বাস্থ্য

মির্জাপুর প্রতিনিধি: মির্জাপুর উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের উফুলকি গ্রামের ঘোষপাড়ার নিভৃত পল্লিতে তৈরি ঘি, ছানা ও টক দই। যা বিক্রি হচ্ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। ঘোষপাড়ার খাঁটি ঘিয়ের সুখ্যাতি দেশজুড়ে। যুগ যুগ ধরে চলা এই ব্যবসা পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এখন জৌলুস হারাতে বসেছে।

 

সরজমিনে ঘোষপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ বাড়িতেই যন্ত্রের শোঁ শোঁ শব্দ, কেউ হাত দিয়ে ঘুরিয়ে যন্ত্র চালাচ্ছেন, কেউবা চালাচ্ছেন বিদ্যুতের সাহায্যে। যন্ত্রের ওপরের পাত্রে ঢালা হচ্ছে দুধ। ভাঙানোর পর এক পাশ দিয়ে বের হচ্ছে মাখন বা ক্রিম, যা থেকে তৈরি হয় ঘি। অন্য পাশ দিয়ে বের হওয়া পাতলা দুধ থেকে তৈরি হচ্ছে ছানা ও টক দই।

 

জানা যায়, স্থানীয়দের কাছে যন্ত্রটি ‘দুধ ভাঙানোর মেশিন’ নামে পরিচিত। পূর্বপুরুষের আমল থেকে যুগ যুগ ধরে এই এলাকার মানুষ দুধ থেকে ঘি, ছানা ও টক দই তৈরি করে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছেন। বাজারে ভেজাল মিশ্রিত খাদ্যদ্রব্যের কারণে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে পেশা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। তবে এখনও শতাধিক পরিবার এই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ চলে। ঘোষপাড়ায় প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ মণ দুধ প্রক্রিয়াজাত করে ঘি, ছানা ও টক দই তৈরি করা হয়। এসব পণ্য মির্জাপুর বাজার, টাঙ্গাইল, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, চকবাজার, কচুক্ষেত ও নারায়ণগঞ্জে সরবরাহ করা হয়। কোনো কোনো দিন দুধের পরিমাণ ৫০ মণে নেমে আসে।

স্থানীয় বাসিন্দা দীপক কুমার ঘোষ বলেন, ঘোষপাড়ায় সনাতন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রায় ৮০ জন নারী-পুরুষ এখনও এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। মুসলমান আছেন প্রায় ২০ জন। হাত দিয়ে মেশিন চালালে ঘণ্টায় প্রায় আট মণ দুধ ভাঙানো যায়। বিদ্যুৎচালিত মেশিনে পরিমাণ আরও বেশি। এক মণ দুধ থেকে গড়ে সোয়া কেজি ঘি এবং মিষ্টি তৈরির জন্য সাত থেকে আট কেজি ছানা পাওয়া যায় বলে জানান।

দীপক কুমার ঘোষ আরো জানান, ছানার তুলনায় টক দই তৈরি করলে লাভ বেশি হওয়ায় সেদিকেই বেশি ঝুঁকছেন তারা। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৭০ টাকা দরে এক মণ দুধ কিনতে খরচ হয় দুই হাজার ৪০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ টাকা। শ্রমিকের মজুরি ও জ্বালানি খরচসহ মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় তিন হাজার ৩০০ টাকা। এক মণ দুধ থেকে পাওয়া ঘি ও ছানা বিক্রি করে আয় হয় তিন হাজার ৬০০ টাকা বা তার কিছু বেশি। টক দই তৈরি করে বিক্রি করলে আয় হয় কিছু বেশি।

আরেক বাসিন্দা গীতা রানী ঘোষ বলেন, ‘পণ্যের অর্ডার বুইঝা দুধ আসে। মাল বেশি গেলে ১২-১৪ মণ, আর কম হইলে ৮-১০ মণ দুধ আসে। দুধ ভাঙানোর সময় আমি সাহায্য করি। পুরুষরা ভাঙাইলে আমি দুধ মেশিনের ওপর দিয়া দিই।’

মির্জাপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন বাজার থেকে ওই দুধ কেনেন বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা রতন ঘোষ। তিনি জানান, শুক্রবার দেলদুয়ার বাজার থেকে প্রতি কেজি ৬০ টাকা দরে চার মণ দুধ কিনেছেন তিনি।

ছানার জন্য দুধ জ্বাল দেওয়ার সময় কথা হয় গ্রামের বাসিন্দা আবদুল খালেকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থিকা কাজ করি। আমারে মাইনষে ঘোষই মনে করে। মানুষ শীতে ঘি বেশি খায়। তখন একটু দাম থাকে।’

জামুর্কী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য সুশীল চন্দ্র গোপ জানান, ঘোষপাড়ার শতাধিক পরিবারের সদস্য এই পেশায় জড়িত। এ ছাড়া এখান থেকে টক দই পাইকারি কিনে ফেরি করে বিক্রি করেন ৮০ জনের বেশি মানুষ। সরকার সহযোগিতা করলে পৈতৃক পেশা ধরে রাখতে পারবেন তারা। তা না হলে এই ঘোষপাড়ার শ্রমিকরা পেশা পাল্টাতে বাধ্য হবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *