মধুপুর বনে লেক খনন নিয়ে বন বিভাগ ও গারো সম্প্রদায়ের বিরোধ

অপরাধ পরিবেশ মধুপুর মানববন্ধন

মধুপুর প্রতিনিধি: মধুপুর বন এলাকার গড়গড়িয়ায় লেক খনন ও সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে বন বিভাগ ও গারো সম্প্রদায়ের একাংশের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। লেক খনন বন্ধের দাবিতে ‘সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র জনতা’ ব্যানারে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কের পঁচিশ মাইল এলাকায় মানববন্ধন কর্মসূচিও পালিত হয়েছে।

 

মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা অভিযোগ করেন, গারোদের প্রথাগত মালিকানাধীন জমিতে লেক খনন ও মাটি ভরাট করা হচ্ছে। তাদের দাবি, গড়গড়িয়া লেক ও আশপাশের ভূমি গারো সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ এবং সেখানে তাদের প্রথাগত ভূমি অধিকার রয়েছে। তাই লেক সম্প্রসারণের কার্যক্রম সম্পূর্ণ অবৈধ।

অন্যদিকে বন বিভাগ এ অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, খরা মোকাবিলা এবং বন্যপ্রাণীর পানীয় জলের সংকট নিরসনে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে লেক সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। স্বার্থান্বেষী মহল অপপ্রচার চালিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।

 

সরেজমিনে দেখা যায়, জাতীয় সদর উদ্যান রেঞ্জের লহুরিয়া বিটের গভীর জঙ্গলের গড়গড়িয়া এলাকায় লেক সম্প্রসারণের কাজ চলছে। দুই টিলার মাঝখানের সর্পিল খালটি বর্ষাকালে আশপাশের টিলা ও বনাঞ্চলের পানি ধারণ করে। অতিরিক্ত পানি বাইদ হয়ে বানার নদীতে গিয়ে পড়ে। বর্তমানে লেকের দুই পাড়ে খননকৃত মাটি জড়ো করা হচ্ছে।

জাতীয় সদর উদ্যান রেঞ্জ অফিস সূত্র জানায়, ‘মধুপুর শালবন পুণরুদ্ধার কার্যক্রম’ এর আওতায় লেকটি ১ হাজার ১৬৫ ফুট পর্যন্ত বর্ধিত করা হচ্ছে। আগে খনন করা ৬৬৫ ফুট দীর্ঘ লেকটি সময়ের সঙ্গে অনেকাংশে ভরাট হয়ে গেছে এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি থাকে না বললেই চলে।

জাউসের ফরেস্ট রেঞ্জার মোশারফ হোসেন বলেন, শুষ্ক মৌসুমে বনাঞ্চলের বানার নদী, শতাধিক বাইদ, খাল ও পুকুর শুকিয়ে যায়। ফলে বন্যপ্রাণী পানির অভাবে জনপদে চলে আসে এবং অনেক সময় হামলা বা প্রাণহানির শিকার হয়। লহুরিয়া বিটের সংরক্ষিত পশু প্রজনন কেন্দ্রে হরিণ, ২০ জোড়া ময়ূর এবং অবমুক্ত কাছিম রয়েছে। যারা খরা মৌসুমে তীব্র পানি সংকটে পড়ে। প্রাণিকূলের পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতেই লেক সম্প্রসারণ করা হচ্ছে বলে তিনি জানান। তার দাবি, ব্যক্তি মালিকানাধীন কোনো জমিতে নয়, সংরক্ষিত বনভূমিতেই লেক খনন কাজ চলছে।

সামাজিক বনায়নের সহব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মোত্তালেব হোসেন বলেন, বনাঞ্চল কমে যাওয়ায় পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। এক সপ্তাহ আগে লেক খননের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গারো নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। যেখানে লেক খনন হচ্ছে সেখানে গারোদের কোনো বাড়িঘর বা আবাদি জমি নেই।

মধুপুর বনাঞ্চলের সহকারী বন সংরক্ষক রানা দেব জানান, লেক সম্প্রসারণ ছাড়াও বনাঞ্চলের আরও ১০টি পুকুর সংস্কার করা হচ্ছে। এতে বনবাসী ও বন্যপ্রাণীর পানি সংকট অনেকাংশে দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠনের সম্পাদক অলিক মৃ এবং বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের শিক্ষা ও সাহিত্য সম্পাদক উজ্জ্বল আজিম এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, এর আগে দোখলা রেঞ্জের চুনিয়া মৌজায় গারোদের আবাদি জমিতে কৃত্রিম লেক খননের চেষ্টা চালানো হয়েছিল, যা আন্দোলনের মুখে বন্ধ হয়। তাদের অভিযোগ, গড়গড়িয়া এলাকাতেও একইভাবে প্রথাগত ভূমি অধিকার উপেক্ষা করে কাজ করা হচ্ছে।

টাঙ্গাইলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহাম্মদ মোহসিন বলেন, সংরক্ষিত বনে কোনো প্রথাগত ব্যক্তিগত ভূমি অধিকার প্রযোজ্য নয়। গারোদের জমিতে লেক খনন হচ্ছে না দাবি করে তিনি বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল গারো যুবকদের উসকে দিয়ে অযথা উত্তেজনা সৃষ্টি করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *