মধুপুর ইসলামিক ফাউন্ডেশন: ফিল্ড সুপারভাইজারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ

অপরাধ দুর্নীতি প্রতিষ্ঠান মধুপুর শিক্ষা

মধুপুর প্রতিনিধি: মধুপুর উপজেলায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীন পরিচালিত ‘নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ উন্নয়নে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম’ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

প্রকল্পটির ফিল্ড সুপারভাইজার আব্দুল আলীমের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ বাণিজ্য এবং কোনো প্রকার নোটিশ ছাড়াই শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অবৈধভাবে ছাঁটাই করার অভিযোগ এনেছেন ভুক্তভোগীরা। এ প্রকল্পের সাথে জড়িত মধুপুর উপজেলার পদবঞ্চিত শিক্ষকবৃন্দ ইসলামি ফাউন্ডেশন মহাপরিচালক বরাবর এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

 

অভিযোগপত্র সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের চলমান ৭ম পর্যায়ে কর্মরত শিক্ষকদের কার্যক্রম পর্যালোচনা ও গুরুতর অভিযোগ না থাকলে প্রকল্পের ৮ম পর্যায়ে তাদের বহাল রেখে কেন্দ্র চালু রাখার নির্দেশনা আসে ফাউন্ডেশন থেকে। কেন্দ্র-শিক্ষক বাছাইপূর্বক ৮ম পর্যায় প্রকল্পে পুনর্বহাল সংক্রান্ত নির্দেশনা আসে। চিঠির ১০টি নির্দেশনার কোনটিতেই পরীক্ষা নেয়ার কথা উল্লেখ নেই।

অথচ গত ৮ ডিসেম্বর লিখিত এবং ১১ ডিসেম্বর মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে অভিজ্ঞ, অধিক যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষককদের বাদ দেয়া হয়েছে। পরীক্ষায় রীতিমত প্রশ্নপত্র তৈরি করে এ পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। প্রাক প্রাথমিক ও সহজ কোরআন শিক্ষায় কর্মরত শিক্ষকদের একই প্রশ্নে ফিল্ড সুপারভাইজার পরীক্ষা গ্রহণ করেন। কিন্তু সে পরীক্ষার আজ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ফলাফল কিংবা মেধা তালিকা প্রকাশ না করেই পরীক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে বা খবর দিয়ে বাদ দিয়েছেন।

 

ভুক্তভোগীদের দাবি, উপ-পরিচালকের নির্দেশ অমান্য করে ফিল্ড সুপারভাইজার নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করে অভিজ্ঞ ও কর্মরত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বাদ দেন। এতে অন্তত ২৫ জন শিক্ষককে নিয়োগ বাণিজ্যের জন্য উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে অযোগ্য বা বাতিল বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু পরীক্ষার কোন ফলাফল প্রকাশ করেননি।

জানা যায়, ২০০৯ সাল থেকে কাজ করা মাওলানা আব্দুল মান্নান, গোলাম মোস্তফা, ২০১৮ সালের নিয়োগ পাওয়া রাবেয়া খাতুন, ২০২৪ এ নিয়োগ পাওয়া মলিদা খাতুন বাদ পরার তালিকায় আছেন। এছাড়াও বাদ পরেছেন নাছিমা, মর্জিনা, আঞ্জু মনোয়ারা, আঙ্গুরী খাতুন, মোঃ আমিনুর, মোঃ এমদাদুল্লাহ প্রমুখ। আরও অভিযোগ করা হয়, ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে কোনো লিখিত নোটিশ বা কারণ দর্শানোর সুযোগ দেওয়া হয়নি। বরং মোবাইল ফোনে কল করে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বাদ দেওয়ার বিষয়টি জানানো হয়, যা সরকারি বিধিমালা ও প্রকল্প নির্দেশিকার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

এছাড়া, ফিল্ড সুপারভাইজার আব্দুল আলীমের বিরুদ্ধে অন্যান্য অভিযোগের মধ্যে রয়েছে- তিনি যাকাতের টাকা ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তিনি বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে টাকা উত্তোলনসহ মাসিক সমন্বয় সভার জন্য অবৈধভাবে টাকা উত্তোলন করেন। তিনি শিক্ষা উপকরণ বিক্রি করেও টাকা আত্নসাৎ করেছেন। তিনি নিয়মিত অফিসে না আসলেও বন্ধের দিনে অফিসে উপস্থিত থাকেন। প্রতি মাসে নিয়মিত কেন্দ্র ভিজিট করার কথা থাকলেও তিনি তা করেন না, তবে ভিজিট করতে গিয়ে টাকা নেন। ইতিপূর্বে এক শিক্ষক এক্সিডেন্ট করায় তার জন্য সংগৃহীত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আর্থিক সহায়তার টাকাও আত্নসাৎ করেছেন। তিনি অফিসের বিদ্যুৎ বিলের টাকা শিক্ষকদের নিকট হতে উত্তোলন করেন বলে জানা যায়।

অভিযোগ পত্রে জানা যায়, ফিল্ড সুপারভাইজার ইউনিয়নভিত্তিক শিক্ষক প্রতিনিধিদের ডেকে জনপ্রতি ৫ হাজার টাকা করে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। যারা এই অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানান, মূলত তাদেরকেই পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এক শিক্ষক তার নির্দেশ দেওয়া কথাগুলো ভিডিও রেকর্ড করে রাখেন। যখন বুঝতে পারেন তার কথার ভিডিও ধারন করা হচ্ছে, তখন ফোন হাত হতে কেড়ে নেন। এছাড়া, যদি কেউ টাকা দিতে না চান, তাহলে তাকে বাদ দেওয়ার হুমকি প্রদান করেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অযুহাতে শিক্ষকদের নিকট হতে টাকা উত্তোলন করার অভিযোগগুলি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে টাঙ্গাইলের উপ-পরিচালক মহোদয়কে জানানো হয়েছে।

অভিযোগে আরো জানা যায়, তার দুর্নীতির বিষয়ে প্রতিবাদ করায় এবং নিয়োগ বাণিজ্যের জন্য উদ্দ্যেশ্য প্রণোদিতভাবে শিক্ষকদের বাদ দেয়াটা প্রকল্প নীতিমালা বহির্ভূত। অভিযুক্ত ফিল্ড সুপারভাইজার পূর্বে গোপালপুর উপজেলায় কর্মরত অবস্থায় এক নারী শিক্ষিকার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ান। সেখান থেকে বহিষ্কৃত হয়ে মধুপুরে যোগদান করেন। মধুপুরে যোগদানের পরও তিনি নিয়মিত অফিসে উপস্থিত না থেকে প্রভাব খাটিয়ে দায়িত্ব পালন করে আসছেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।

তবে, অভিযুক্ত ফিল্ড সুপারভাইজার আব্দুল আলীমের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা, ভিত্তিহীন দাবি করে অস্বীকার করেছেন। তবে তিনি জানান, যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিষয়টি অবগত আছেন।

মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মির্জা জুবায়ের হোসেন লিখিত অভিযোগ প্রাপ্তির কথা স্বীকার করে জানান, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে বিষয়টি তদন্ত করার জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম খান দায়িত্ব পাওয়ার কথা স্বীকার করে জানান, প্রাথমিকের ভাইভা পরীক্ষার কাজে তিনি জেলায় ব্যস্ত ছিলেন। দ্রুত এ বিষয়ের তদন্ত কাজ শুরু করবেন।

টাঙ্গাইল ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি যাচাই-বাছাই কমিটি রয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন-এর এবারের নির্দেশনায় কোরআন সহীহ শুদ্ধভাবে উচ্চারণ যোগ্যতা প্রধান বিবেচ্য। না পারলে অন্য যোগ্যতা থাকলেও তারা বাছাইয়ে বাদ পড়বেন। বাছাই কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বাছাই প্রক্রিয়ায় যে কোন পদ্ধতি গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখেন বলেও জানান তিনি। অন্যান্য অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘আমি গত ২০২৫ খ্রি. নভেম্বরে এখানে জয়েন করেছি। বেশিরভাগ অভিযোগ আমার এখানে জয়েন করার পূর্বের।’ তবে গঠিত তদন্ত কমিটি তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *