টাঙ্গাইলের তিন যুবক ঋণ করে রাশিয়ায় গিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে প্রাণ হারালেন

অপরাধ গোপালপুর দুর্ঘটনা দুর্নীতি প্রবাস

গোপালপুর প্রতিনিধি: গোপালপুর উপজেলার ভিন্ন ভিন্ন গ্রামে নজরুল ইসলাম, পবিত্র চন্দ্র ও আমিনুর ইসলাম- এই তিনজনের বাড়ি। তাঁরা সবাই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। কেউ ঋণ নিয়ে, কেউ জমি বন্ধক রেখে কাজের উদ্দেশ্যে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে তাঁদের কারও ভাগ্যেই কাজ জোটেনি। বরং বাধ্য হয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে হয়েছে তাঁদের। সেখানে ড্রোন হামলায় সম্প্রতি তিনজনেরই মৃত্যু হয়েছে।

 

জানা যায়, কাজের জন্য রাশিয়ায় গিয়ে প্রতারিত ৩০ জন বাংলাদেশি তরুণ-যুবকের মধ্যে ২০ জন যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে এই তিনজনও রয়েছেন। নজরুল ইসলামের ভাতিজা মোহাম্মদ শিহাব বলেন, চাচার সঙ্গে তাঁদের সর্বশেষ কথা হয়েছিল গত ২৯ জুলাই। সেদিন নজরুল বলেছিলেন, ‘আমাদের যুদ্ধে পাঠায় দিচ্ছে। আমার মাকে দেখে রাখিস, সন্তানদের দেখে রাখিস।’ পরে রাশিয়ায় তাঁর সঙ্গে যাওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে মৃত্যুর খবর পায় পরিবার।

 

নজরুল ইসলামরা দুই ভাই ও তিন বোন। তিন বোনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। দুই ভাই যৌথ পরিবারে একসঙ্গে থাকতেন। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া তাঁদের জমি এখনো ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়নি। সেই জমি স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছে বন্ধক রেখে বড় ভাই নজরুলকে ৯ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। ওই টাকা দিয়েই রাশিয়ায় গিয়েছিলেন নজরুল। এর আগে তিনি সৌদি আরবেও গিয়েছিলেন।

নজরুলের ভাতিজা জানান, রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে চাচার মৃত্যুর খবর এলাকায় পৌঁছানোর পর জমি বন্ধক রাখা ব্যক্তি টাকা ফেরত দিতে না পারলে সমপরিমাণ জমি দিয়ে দেওয়ার কথা বলছেন। ৪০ বছর বয়সী নজরুল দুবার বিয়ে করেছিলেন। প্রথম স্ত্রীর ঘরে তাঁর দুই ছেলে রয়েছে। তাদের বয়স ১৫ ও ১০ বছর। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হলেও সন্তানদের খোঁজখবর রাখতেন তিনি। তবে নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী ও তাঁদের দুই সন্তান খুবই করুণ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। এই সংসারে তাঁর সোয়া এক বছর বয়সী একটি মেয়ে ও ছয় মাস বয়সী একটি ছেলে রয়েছে।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী ও দুই সন্তান এখনো যৌথ পরিবারে থাকছেন। কিন্তু তাঁর বড় ভাইয়ের আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। একসময় ঢাকায় সবজির ব্যবসা করতেন তিনি। কিছুদিন রিকশাও চালিয়েছেন। বর্তমানে বাড়িতেই থাকেন। যৌথ পরিবারের জমি বন্ধক থাকায় তিনি কোনো কিছু করতে পারছেন না। টাকা ফেরত দিয়ে জমি ছাড়িয়ে নেওয়ার সামর্থ্যও তাঁর নেই।

নজরুলের পরিবারের মতোই দুরবস্থায় দিন কাটছে পবিত্র চন্দ্রের পরিবারের। হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান পবিত্র পেশায় ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বিক্রির কিছু টাকা এবং একটি বেসরকারি সংস্থা ও স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ভাগ্য বদলানোর আশায় রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁকেও জোর করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। বেঁচে ফেরা সঙ্গীদের কাছ থেকে তাঁর পরিবার জানতে পেরেছে, যুদ্ধক্ষেত্রে পবিত্রর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুশোকের পাশাপাশি এখন পাওনাদারদের অব্যাহত তাগাদায় বিপর্যস্ত পরিবারটি।

পবিত্রের ভগ্নিপতি তপন চন্দ্র সূত্রধর বলেন, পরিবারটির অবস্থা এমন হয়েছে যে ভাত খেতে বসলে ঋণদাতারা টাকার জন্য পেছনে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন। এখন অবশিষ্ট তিন শতাংশ জমি বিক্রির চিন্তা করা হচ্ছে। কিন্তু সেই জমি বিক্রি করেও ঋণ শোধ করা সম্ভব হবে না। তবু পরিবারটি এখনো মনে করছে, পবিত্র হয়তো বেঁচে আছেন।

গোপালপুর উপজেলার আমিনুর ইসলামও রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গেছেন। তাঁর পরিবারের কারও সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে অন্য ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, আমিনুর নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন। পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাতে ঋণ করে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পরিবারের ভাগ্য বদলানো তো দূরের কথা, নজরুল ও পবিত্রর মতো তাঁকেও যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিতে হয়েছে।

১৪ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) জানায়, গত ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। তাঁদের মধ্যে নজরুল, পবিত্র ও আমিনুরও ছিলেন। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে কাজ দেওয়ার কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে ১০ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়। রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চাকরি না দিয়ে তাঁদের পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর তাঁদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের নামানো হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে।

এসআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে বাংলাদেশিদের একধরনের টোপ হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হতো। তাঁদের ওপর ড্রোন হামলা হলে হামলাকারীদের অবস্থান ও দূরত্ব শনাক্ত করা যেত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *