
নিজস্ব প্রতিবেদক: টাঙ্গাইলের একসময়ের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র ভাসানী হল ছিল নাটক, সংগীত, নৃত্য, কবিতা, বইমেলা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা আয়োজনের প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর। অথচ দীর্ঘদিনের অবহেলা, সংস্কারের অভাব ও প্রশাসনিক উদাসীনতায় সেই ঐতিহ্যবাহী মিলনায়তন এখন পরিণত হয়েছে এক পরিত্যক্ত ভবনে।
স্থানীয়রা বলছেন, দিনে হলটির বারান্দায় বসে পানের দোকান, প্রাঙ্গণে ট্রাকস্ট্যান্ড; আর সন্ধ্যা নামলেই জায়গাটি হয়ে ওঠে মাদকসেবী ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের আড্ডাখানা। এতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, নাট্যকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ভাসানী হল শুধু একটি ভবন নয়; এটি টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। দ্রুত সংস্কার না হলে জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনা হারিয়ে যেতে পারে।
জানা যায়, টাঙ্গাইল শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রায় ৩৫ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত ভাসানী হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ১৯৭৬ সালের ১৬ আগস্ট। তৎকালীন রাষ্ট্রপতির শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আবুল ফজল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯৭৮ সালের ২ এপ্রিল দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত মিলনায়তনের উদ্বোধন করেন তৎকালীন ঢাকা বিভাগের কমিশনার খানে আলম খান।
প্রথমে এর নাম ছিল ‘টাঙ্গাইল টাউন হল’। পরে টাঙ্গাইল পৌরসভার চেয়ারম্যান ও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জামাতা প্রয়াত সামছুল হকের উদ্যোগে সর্বসম্মতিক্রমে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ভাসানী হল’। এরপর থেকেই এটি জেলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
তবে প্রায় অর্ধশত বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক ভবনটি নিয়মিত সংস্কারের অভাবে ধীরে ধীরে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। প্রায় এক যুগ আগে প্রশাসন এটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। এরপর থেকেই বন্ধ হয়ে যায় জেলার অন্যতম বড় এই মিলনায়তনের কার্যক্রম। যে হল একসময় সাংস্কৃতিক কর্মীদের পদচারণায় মুখর থাকত, সেটি এখন ধুলোবালি, ভাঙাচোরা দেয়াল, খসে পড়া পলেস্তারা আর তালাবদ্ধ কক্ষের নিস্তব্ধতায় ঢাকা।
সরেজমিনে দেখা যায়, হলের সামনের বারান্দায় বসেছে পানের পাইকারি দোকান। পুরো প্রাঙ্গণ ব্যবহার হচ্ছে ট্রাকস্ট্যান্ড হিসেবে। বিভিন্ন স্থানে ছিন্নমূল মানুষ অবস্থান করছেন। সন্ধ্যার পর পুরো পরিবেশ বদলে যায়। নিয়মিত মাদকসেবীদের আনাগোনা শুরু হয়। পাশাপাশি অসামাজিক কর্মকাণ্ডও চলে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত থাকায় ভবনটির নিরাপত্তা ও তদারকি প্রায় নেই বললেই চলে।
স্থানীয় বাসিন্দারা আরো জানান, একসময় যে জায়গায় পরিবার নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে আসতেন মানুষ, এখন সন্ধ্যার পর সেখানে যেতেও ভয় পান অনেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৫ সালে একবার হলটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার কোনো বাস্তব প্রতিফলন আজ অবধি দেখা যায়নি। এদিকে চলতি বছরের ১২ জুন স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু হলটি পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি এ হলের পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
টাঙ্গাইলের সংস্কৃতিকর্মীরা বলেন, এক হাজার আসন বিশিষ্ট এই মিলনায়তনটিতেই জেলার সব সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক অনুষ্ঠান পরিচালিত হতো। শুধু তাই নয়, এই মিলনায়তনটি ঘিরেই নাট্যচর্চাসহ সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়মিত আড্ডা বসত। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে এর চত্বরে হতো বইমেলা।
তারা বলছেন, এখানে ঈদের সময় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কনসার্টের আয়োজন করতো। এছাড়াও এ ভাসানী হলে জেলার অনেক রাজনৈতিক সভা-সমাবেশও অনুষ্ঠিত হতো। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মূলকেন্দ্র ছিল হলটি। কিন্তু প্রায় ১ যুগ ধরে হলটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের গীতিকার মাসুম ফেরদৌস বলেন, আগের পাড়া মহল্লায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিলো। তারা বিভিন্ন উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নাটকের আয়োজন করতো। তখন পুরো টাঙ্গাইলের এই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ভাসানী হল মুখর থাকতো। এখন সেই সাংস্কৃতিক সংগঠনও নেই, যার কারণে ভাসানী হল ধীরে ধীরে তার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছে।
সুরকার ও শিল্পী ফিরোজ বাচ্চু বলেন, ভাসানী হল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমি ছিলাম। হলটি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য খুবই উপকার ছিলো। এখন একটি ভালো অনুষ্ঠান করতে গেলে শিল্পকলা অ্যাকাডেমিতে যেতে হয়। তবে আগের মতো এতো বড় করে আমরা অনুষ্ঠান করতে পারি না। হলটি টাঙ্গাইলের জন্য খুবই প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবি মাহমুদ কামাল বলেন, ‘দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত এ হলটিকে পুনর্নির্মাণ কিংবা সংস্কার করার দাবি ছিল। হলটি মওলানা ভাসানীর নামে থাকায় ব্যাপারে বিগত সরকার সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমান সরকারের কাছে দাবি করছি, ভাসানী হলটি পুনর্নির্মাণ কিংবা সংস্কার করা হোক।
টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হারুন অর রশিদ বলেন, ‘টাঙ্গাইল একটি সাংস্কৃতিক নগরী এবং পুরাতন জেলা। সে হিসেবে টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম প্রধান জায়গা হচ্ছে ভাসানী হল। প্রায় ১ যুগ ধরে এটি অবহেলিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে গতিশীল রাখার জন্য ভাসানী হল খুবই প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সমাজের যে মাদকের ছোবল এবং কিশোর গ্যাংয়ের যে উৎপাত, এর থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদেরকে ক্রীড়া অঙ্গন এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে মুখরিত রাখতে হবে। তার জন্য একটি ভালো অডিটরিয়াম প্রয়োজন। আমি দ্রুতই ভাসানী হলটি সংস্কারের দাবি করছি।
এ বিষয়ে জানতে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শরীফা হকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, ভাসানী হল টাঙ্গাইলের জন্য অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ। টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যারা বিচরণ করেন তাদের কোনো জায়গা নেই। মওলানা ভাসানী বাংলাদেশের একজন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। কাজেই তার স্মৃতিবিজড়িত ভাসানী হলকে রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়িত্ব আমাদের। ইতোমধ্যেই আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে করা সম্ভব সেটিই আমরা পদক্ষেপ নিবো।
