
ভূঞাপুর প্রতিনিধি: ভূঞাপুর উপজেলার কয়েড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে বেশ কয়েকবার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার ফি বাবদ টাকা নেয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ, শিক্ষাসামগ্রী ক্রয় এবং অন্যান্য খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের ব্যবহারে অসঙ্গতি রয়েছে। এছাড়া সরকারি অনুদান ও তহবিলের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কয়েড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ জানান, সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার ফি বাবদ টাকা নেয়া, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব, শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণে অনিয়ম, বিদ্যালয়ের উন্নয়নমূলক কাজের অর্থ ব্যয়ে অসঙ্গতি এবং শিক্ষক কর্মচারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের ঘটনা ঘটছে। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের কেন্দ্র সংস্কার বাবদ দুই ধাপে (৩৩৩৩৩ টাকা ও ৬৬৬৬৭ টাকা) মোট এক লক্ষ টাকা এসেছে। টাকা খরচ না করে আত্মসাৎ করেছে। ৬৬,৬৬৭ টাকার কাজের তালিকায় একটি মাত্র কাজ অফিসের সামনের বারান্দার গ্রীল করার করার জন্য পরিমাপ ও উদ্যোগ গ্রহণ করার পর, সে কাজও করা হয়নি। স্লিপ ও ওয়াসব্লকের বরাদ্ধ টাকাও খরচ করেন না। সরকারিভাবে বিভিন্ন দিবসের বরাদ্ধকৃত টাকাও আত্মসাৎ করেন। ১ম থেকে ৫ম শ্রেণির ছাত্র ছাত্রীদের পরীক্ষার ফি নেওয়ার নিয়ম নেই। ইতিপূর্বে তদন্ত কমিটি পরীক্ষার ফি ফেরত দেয়ার নির্দেশ দিলেও, তিনি প্রতিবারের মতো এবারও পরীক্ষার ফি আদায় করে পরীক্ষা নেন।
শিক্ষকগণ আরো বলেন, এর আগে উপজেলা শিক্ষা অফিসার বরাবর অভিযোগ দেয়া হয়েছিল, তদন্তে এসে পরীক্ষার ফি ফেরত দিতে বলেছিল কিন্তু প্রধান শিক্ষক সেই টাকা ফেরত দেন নাই। বিদ্যালয়ের কয়েক বছরের পরীক্ষার খাতা অপ্রয়োজনীয় কাগজ দুই ধাপে ৩৫,০০০ টাকা বিক্রি করেছেন। সেই টাকা বিদ্যালয়ের কোনো কাজে ব্যবহার করেন নাই। বিদ্যালয়ে জমাকৃত সকল পুরাতন বই (প্রায় ৩০ মন) নিলামে না দিয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসে জমাদানের কথা বলে সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারের সহায়তায় বিক্রি করে দিয়েছেন। বিদ্যালয়ে খরচ করার জন্য যে টাকা আসে তা তিনি যথাযথ ব্যবহার করেন না এমন অভিযোগ করেন অন্যান্য শিক্ষকগণ। বিদ্যালয়ে নিয়মিত কমিটি না থাকায় এডহক কমিটির সভাপতি সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ শাহিনুর ইসলাম তিনি তার দায়িত্ব ঠিকমতো পালন না করে ম্যানেজ হয়েছেন, এমন কথাও বলেন শিক্ষকগণ।
স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এসব অভিযোগ থাকলেও শিক্ষা অফিস কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তারা বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। অনিয়মের প্রতিবাদ করায় সহকারী শিক্ষকদের বদলি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও গণমাধ্যমে এসেছে।
স্কুলের জমিদাতা পরিবারের সদস্য মোঃ শরিফুল ইসলাম বলেন, ঐতিহ্যবাহী কয়েড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম সম্পর্কে বিদ্যালয়ের দাতা সদস্যের পক্ষ থেকে এবং গ্রামের অভিভাবকদের পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও শিক্ষা অফিস বরাবর লিখিত অভিযোগ হয়েছে। এর তদন্তের পর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেয়া পরীক্ষার ফিস ফেরত দেয়ার কথা বলা হলেও, সে টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি। এরপর ধারাবাহিকভাবে একইভাবে পরীক্ষার ফিস নেয়া হয়েছে। এছাড়া যে সকল অনিয়ম ও ব্যবস্থাপনা ছিল, সেগুলো একই অবস্থায় চলছে। বর্তমানে লেখাপড়ার মান নিম্নগামী। স্কুলের দোলনা ও খেলাধুলার সরঞ্জামগুলো অকেজো অবস্থায় রয়েছে।
এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর জন্য তিনি একা দায়ি নন, উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার মোঃ শাহীনুর ইসলাম এই স্কুলের এডহক কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। অর্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তার সাথে আলোচনা করেই করা হয়েছে। ইতিপূর্বে সহকারী শিক্ষা অফিসার যে উপজেলায় ছিলেন, সেখানেও অনিয়মের সাথে জড়িত ছিলেন, কিন্তু দোষ হয় শুধু প্রধান শিক্ষকের।
উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার উক্ত স্কুলের এডহক কমিটির সভাপতি মোঃ শাহীনুর ইসলাম বলেন, সংশ্লিষ্ট বিষয় গুলোর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ দায় ওই প্রধান শিক্ষকের। এ বিষয়ে সে নিজে দোষ মুক্ত হওয়ার জন্য আমার উপর দায় চাপাচ্ছে। তার বিষয়ে সকলেই অবগত রয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার জানান, অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ হারুনর রশিদ বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অবৈতনিক এবং বিনামূল্যে লেখাপড়ার নির্দেশ রয়েছে। এখানে পরীক্ষার ফি নেওয়ার কোন বিধান নেই। সংশ্লিষ্ট উপজেলা শিক্ষা অফিসারের সাথে কথা বলে অভিযোগগুলো আমরা তদন্ত করবো। একটা সরকারি প্রতিষ্ঠান সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক চলবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, ওই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বেও ভূঞাপুর উপজেলার ভালকুটিয়া স্কুলে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে লিখিত অভিযোগ হয়েছিল ইউএনও অফিসে। ওই স্কুলের অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছিল। বিদ্যালয়ের শিক্ষকগন, ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবকগণ ও এলাকাবাসী সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
