মধুপুরের ঐতিহ্যবাহী আনারস ক্রমেই ঐতিহ্য হারাচ্ছে!

অর্থনীতি কৃষি পরিবেশ মধুপুর

মধুপুর প্রতিনিধি: মধুপুরের ঐতিহ্যবাহী আনারসের একসময় স্বাদ ও সুগন্ধের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত ছিল। এখন সেই আনারসই অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। এতে আনারসের স্বাদ ও ঘ্রাণ হারিয়ে যাচ্ছে। আকারে বড় ও রঙে আকর্ষণীয় হলেও কমছে ক্রেতার আগ্রহ। ফলে গত বছরের তুলনায় কম দামে চাষিদের আনারস বিক্রি করতে হচ্ছে।

 

কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, দেশের অন্যতম আনারস উৎপাদনের এলাকা মধুপুর। চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৬ হাজার ৬৩৮ হেক্টর জমিতে আনারসের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ক্যালেন্ডার (জায়ান্ট কিউ) জাতের আনারস ৪ হাজার ৩৭৫ হেক্টরে, জলডুগি ২ হাজার ২৪৫ হেক্টরে এবং এমডি-২ জাতের আনারস ১৮ হেক্টরে চাষ করা হয়েছে। এ মৌসুমে প্রায় আড়াই লাখ টন আনারস উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

জানা যায়, পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি মেঘালয় থেকে চারা এনে মধুপুর গড় এলাকায় আনারসের চাষ শুরু হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই এ আনারস সারা দেশে পরিচিতি পায় বলে জানান মধুপুরের গারো সম্প্রদায়ের প্রবীণ বাসিন্দা অজয় এ মৃ। তিনি বলেন, প্রায় দুই দশকে এলাকার যোগাযোগব্যবস্থার অনেক উন্নয়ন হয়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে এখানে জমি ইজারা (লিজ) নিয়ে আনারস চাষ করছেন। তারা অতিরিক্ত লাভের জন্য হরমোন ও রাসায়নিক প্রয়োগ করছেন। এতে আনারসের স্বাদ নষ্ট হচ্ছে। সাধারণ কৃষক যাঁরা পরিমিত রাসায়নিক বা রাসায়নিক মুক্ত আনারস চাষ করছেন, তাদের অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ফলন ভালো হয়েছে। মৌসুমের শুরু থেকেই কৃষকেরা গারোর বাজার ও জলছত্রের পাইকারি হাটে আনারস বিক্রি করছেন। তবে এবার দাম অনেক কম।

হাগুড়াকুড়ি গ্রামের চাষি সোহেল রানা বলেন, তিনি চার বিঘা জমিতে ২২ হাজার আনারস চাষ করেছেন। কোনো ধরনের রাসায়নিক বা হরমোন ব্যবহার না করায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। ফলে তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি করতে হয়; কিন্তু অনেক ক্রেতা সেই দাম দিতে চান না। এ কারণে অনেক চাষি বাধ্য হয়ে রাসায়নিক ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন।

গত মঙ্গলবার ওই দুই পাইকারি হাটে গিয়ে কয়েকজন চাষি ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আনারসের আকার বড় করা, একসঙ্গে ফল ধরানো এবং দ্রুত পাকানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে আনারস দেখতে আকর্ষণীয় হলেও আগের মতো স্বাদ ও ঘ্রাণ থাকছে না। এর প্রভাব পড়ছে বাজারে। ক্রেতার আগ্রহ কমে যাওয়ায় দামও কমে গেছে।

চাষি ও ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, আনারসের আকার বড় করতে প্যানোফিক্স, সুপারফিক্স, ক্রপকেয়ার, অঙ্কুরসহ বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। দ্রুত পাকানোর জন্য প্রয়োগ করা হয় রাইফেন, হারবেস্ট, প্রমোট, সারাগোল্ড, ক্রিটিপাস ও অ্যালপেনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক। এসব ব্যবহারে অপরিপক্ব গাছেও ফল আসে। স্থানীয়ভাবে এসব রাসায়নিক প্রয়োগকে চাষিরা ‘গর্ভবতী’ নামে অভিহিত করেন।

হাগুড়াকুড়ি গ্রামের চাষি মিজানুর রহমান বলেন, রাসায়নিক স্প্রে করলে চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যেই সব আনারস পেকে যায়। এতে একসঙ্গে সব আনারস বাজারজাত করা যায়। আর রাসায়নিক না দিলে আস্তে আস্তে পাকে। বাজার ধরতে অসুবিধা হয়। চাষিদের ভাষ্য, সাধারণ একটি আনারস গাছে ৬০টি পাতা হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে আনারস ধরে; কিন্তু ২৮টি পাতা হওয়ার পরেই এসব রাসায়নিক ব্যবহার করলে আনারস ধরে।

জলছত্র বাজারের আনারসচাষি রনি মিয়া বলেন, গত বছর যে আনারস ৩০ থেকে ৩৫ টাকা পাইকারি দরে বিক্রি করেছি, একই আকারের আনারস এবার ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।

গারোর বাজারে আনারসের পাইকারি ব্যবসায়ী লোকমান হোসেন বলেন, রাসায়নিক ব্যবহারে ক্রেতাদের আগ্রহ কমছে। আগে ধাপে ধাপে আনারস বাজারে আসত, তখন বিক্রি ও লাভ—দুটিই বেশি ছিল। এখন একসঙ্গে বাজারে আসায় দাম পড়ে যাচ্ছে। স্বাদও আগের মতো নেই।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শহীদ মাহমুদ বলেন, ‘মধুপুরের আনারস এ অঞ্চলের ঐতিহ্য। অতিরিক্ত হরমোন ও রাসায়নিক ব্যবহারে সেই ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষকদের সচেতন করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।’

মধুপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মমতাজ মুনা বলেন, মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা চাষিদের অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার না করার পরামর্শ দিচ্ছেন। কৃষকদের আরও সচেতন করতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত কার্যক্রম নেওয়া হবে।

টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ফুড টেকনোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. আজিজুল হক জমিতে রাসায়নিক ব্যবহার করা প্রসঙ্গে বলেন, কৃষিকাজে বা আনারস উৎপাদনে অণুজীবের আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় পরিমিত রাসায়নিকের ব্যবহার দোষের নয়; কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে। নিরাপদ কৃষি খাদ্য উৎপাদনে কৃষককে অবশ্যই কৃষি বিভাগের নির্দেশক ও পরামর্শ সঠিকভাবে মেনে চলা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *