
নিজস্ব প্রতিবেদক: টাঙ্গাইলে আওয়ামী লীগ নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলায় হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে আদালত এলাকা থেকে টাঙ্গাইল পৌরসভার সাবেক মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তিকে আটক করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে হাজিরা শেষে হুইলচেয়ারে করে আদালত কক্ষ থেকে বের হওয়ার সময় তাকে গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের ওপর হামলা মামলায় আটক করে সদর থানা পুলিশ।
প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন জানান, হাজিরা শেষে দুপুর ১২টার দিকে হুইলচেয়ারে করে আদালত কক্ষ থেকে তাকে বের করা হয়। এ সময় আদালত চত্বরে অতিরিক্ত পুলিশের উপস্থিতি দেখা যায়। পুলিশ আগেই সহিদুরকে বহন করে আনা অ্যাম্বুলেন্সটি আদালত ভবনের সামনে থেকে সরিয়ে দেয়। পরে সহিদুর আবার আদালতকক্ষে ফিরে যান। বিকেল সোয়া ৩টার দিকে তিনি আবার হুইলচেয়ারে আদালতকক্ষ থেকে বের হন। আদালত চত্বর থেকে বাইরে আসার পর সদর থানা-পুলিশের একটি দল ঘিরে ধরে পুলিশের আনা মাইক্রোবাসে উঠতে বলে। সহিদুরকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে পুলিশ তাকে আটকের কথা জানায়। কোন মামলায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে জিজ্ঞাসা করলে ওসি তানভীর তাকে বলেন, ‘আমাদের সাথে চলেন, সব জানানো হবে।’
আটকের সময় জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি-দক্ষিণ) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মীর মোশারফ হোসেন, গোয়েন্দা শাখার (ডিবি-উত্তর) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবিএমএস দোহাসহ অন্যান্য গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সহিদুর রহমান খান মুক্তি এখন থানাতেই অবস্থান করছেন। পরে তাকে ২০২১ সালের ১৭ নভেম্বর টাঙ্গাইল মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নুরুল হক নুরের ওপর হামলার মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।
রাতে টাঙ্গাইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তানভীর আহম্মদ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। শুক্রবার আদালতে হাজির করে অধিকতর জিজ্ঞাবাদের জন্য তার সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করা হবে।
আদালত সূত্র জানায়, ফারুক আহমেদ হত্যা মামলায় সহিদুর রহমান গত ২২ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইল প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে স্থায়ী জামিন লাভ করেন। পরে তিনি ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। বৃহস্পতিবার মামলার ধার্য তারিখে তিনি অ্যাম্বুলেন্সযোগে আদালতে আসেন। মুক্তির বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ টাঙ্গাইল সদর থানায় বিশেষ ট্রাইব্যুনালে ২০১৫ সালে একটি মামলা রয়েছে।
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু জানান, টাঙ্গাইল পৌরসভার সাবেক মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তির নামে বিভিন্ন ধরনের মামলা রয়েছে। সে কারণেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, সহিদুর রহমান খান মুক্তি টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান খানের ছেলে এবং ওই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানার ভাই।
জানা যায়, ২০২১ সালের ১৭ নভেম্বর মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিপি নুরের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকাররে পতন হওয়ায় প্রায় তিন বছর পর সেই ঘটনার জন্য ওই দলের উচ্চতর পরিষদ সদস্য ও দপ্তর সম্পাদক শাকিল উজ্জামান বাদি হয়ে মামলা দায়ের করেন। গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে টাঙ্গাইল সদর থানায় এই মামলা তালিকাভুক্ত (রেকর্ড) করা হয়।
মামলায় শাকিলুজ্জামান অভিযোগ করেছেন, টাঙ্গাইলের সন্তোষে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মুক্তমঞ্চের কাছে পৌঁছার পর ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের (নিষিদ্ধ সংগঠন) সভাপতি মানিক শীল ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নিবিড় পালের নেতৃত্বে তাদের ওপর হামলা করা হয়। তারা হত্যার উদ্দেশ্যে নুরুল হক নুরের ওপর হামলা করে। তাদের হামলায় বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হন।
পরে কতিপয় পুলিশ সদস্যের সহায়তায় তারা জীবন নিয়ে ফিরে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালসহ ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। ঘটনার পর তারা মামলা করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু টাঙ্গাইল সদর থানা কর্তৃপক্ষ সে সময় মামলা গ্রহণে অসম্মতি জানায়। এরপর গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে টাঙ্গাইল সদর থানায় এই মামলা তালিকাভুক্ত (রেকর্ড) করা হয়।
মামলায় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুর রহমান খান ফারুক, সাধারণ সম্পাদক জোয়াহেরুল ইসলাম, নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়, সাবেক সাধারণ লেখক ভট্টাচার্যসহ অন্যদের আসামি করা হয়।
মামলায় অন্য আসামিরা হলেন- সাবেক সংসদ সদস্য তানভীর হাসান ছোট মনির, ছানোয়ার হোসেন ও খান আহমেদ শুভ, টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র এসএম সিরাজুল হক আলমগীর, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুজ্জামান সোহেল, শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমএ রৌফ, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফারুক হোসেন, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক মাতিনুজ্জামান খান, জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি রেজাউর রহমান, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান, সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক রনি আহমেদ প্রমুখ।