সখীপুর উপজেলায় সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ঘটেছে ব্যাপক অবনতি!

অপরাধ পরিবেশ ফিচার সখিপুর

সখীপুর প্রতিনিধি: টাঙ্গাইল জেলার মধ্যে সখীপুর উপজেলায় সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ঘটেছে ব্যাপক অবনতি। খুন, ধর্ষণ, মাদক, মারামারি, চুরি, ছিনতাই, ইভটিজিং, অপহরণ, বাল্যবিয়ে, জমি দখল বেড়ে সখীপুর এখন ভয়ঙ্কর হয়ে অপরাধের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে।

 

 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গত ২ মাসে ১০-১৫ টি আত্মহত্যা এবং ৫টি ভয়াবহ খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বাঘেরবাড়ি গ্রামে রাতের আঁধারে চাচা মজনু মিয়া ও ভাতিজা শাহজালালকে কুঁপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

 

 

একই ইউনিয়নের ছোটচওনা গ্রামে আলমিনা নামের এক তরুণীর মরদেহ পাওয়া যায়। আল মিনার দাদা টেপু মিয়ার দাবি তার নাতীকে হত্যা করে পোল্ট্রি লেয়ারের পাশে ফেলে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে নিখোঁজের একদিন পর বাড়ির পাশে পরিত্যক্ত জমি থেকে আরফান আলী (৬০) নামের এক বৃদ্ধের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ৪ সেপ্টেম্বর সোমবার দুপুরে উপজেলার হতেয়া উলিয়ারচালা গ্রাম থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের ধারণা তাকে হত্যা করা হয়েছে।

 

 

গত ৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার অপহরণের ২ দিন পর তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিয়ার (৯) লাশ বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে বনের ভেতর একটি ড্রেন থেকে উদ্ধার করা হয়। সামিয়া দাড়িয়াপুর গ্রামের রঞ্জু মিয়ার মেয়ে। অপহরণকারীরা মোবাইল ফোনে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। মুক্তিপনের সেই টাকা দিতে না পারায় লাশ হয়ে পরিবারের কাছে ফিরতে হলো শিশু সামিয়াকে। এই ঘটনায় পুলিশ এখনো কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।

জানা যায়, উপজেলার কচুয়া চাঁদেরহাট এলাকার একটি জঙ্গলে গত ৩ আগষ্ট স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ওই এলাকার ছয়জনকে গ্রেফতার করা হলেও বর্তমানে তারা প্রায় সবাই জামিনে মুক্ত রয়েছেন।

অন্যদিকে শহর ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সোহেল খান ফাহাদের বিরুদ্ধে এক তরুণী ধর্ষণের অভিযোগ আনেন। ওই তরুণী দাবি সে চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তার পেটে ওই সন্তানের বাবা ফাহাদ। স্ত্রীর অধিকার ও বাচ্চার স্বীকৃতি না পেলে ওই ছাত্রলীগ নেতার বাসার সামনে গিয়ে আত্মহত্যা করবে বলে হুমকি দেয়। পরে ওই ছাত্রলীগ নেতা তাকে বিয়ে করেন।

জানা যায়, উপজেলার এক কলেজ ছাত্রী (১৯) নাতীকে ব্লাক মেইল করে দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক সম্পর্ক করে আসছে তার দাদা (দাদির দ্বিতীয় স্বামী)। ওই ছাত্রী বর্তমানে তার এক খালার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। তার দাবি সেখানেও লম্পট দাদা তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছেন। সে এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

গত ১৪ আগষ্ট পঞ্চম শ্রেণী পড়ুয়া এক ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করে উপজেলার জামালহাটখুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জয়নাল আবেদিন। পরে এর সত্যতা পেয়ে ওই শিক্ষককে এক মাসের কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ১৫ দিন জেল হাজতে থেকে ওই শিক্ষক এখন জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দেড় মাসে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে প্রায় ১২টি বাল্যবিবাহ হয়েছে। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে জানালেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ তথ্যদাতাদের।

জানা যায়, গত দুই মাসে বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রায় ১৫-২০ টি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফর্মা চুরি হয়েছে। এ নিয়ে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের মধ্যে প্রচন্ড ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। এছাড়া, গত ২২ আগস্ট উপজেলার কালিয়া ইউনিয়নের রামখা এলাকার প্রবাসী নুরু মিয়ার বাড়িতে ভয়ঙ্কর চুরির ঘটনা ঘটে। এতে প্রায় নগদ ১৬ লাখ টাকা ও ১০ ভরি স্বর্ণলঙ্কার চুরি করে। এ ঘটনায় জড়িত ২ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

গত রবিবার সকালে উপজেলার বেতুয়া পশ্চিমপাড়া এলাকায় কাদের মিয়ার চায়ের দোকান সংলগ্ন গজারি বনের কাছে চালককে নেশা দিয়ে অটো ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ওই অটোচালকের বাড়ি সিলিমপুর গ্রামে। পরে কয়েকজন পথচারী সামনে আসলে তারা ছিনতাইকারীরা অটো ফেলে চলে যায়।

সূত্র জানায়, উপজেলায় কয়েকটি চোর ও ছিনতাকারী গ্রুপ রয়েছে। এরা বিভিন্ন এলাকায় অপকর্ম করে বেড়ায়। এদের কয়েকজনের কাজ দিনে নানা অজুহাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং রাতে চুরি করা।

জানা যায়, পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি (অবঃ) সেনা সদস্য ও প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা এস এম শাহজাহান আলীর ( ৮০) এক একর জমি দখলের করে নিয়েছেন উপজেলার যুবদলের সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বাচ্চু (৫০)। গত ২০ আগষ্ট ভোর রাতে সন্ত্রাসী কায়দায় দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ভাড়াটে লোকজন নিয়ে ওই জমিতে টিন দিয়ে বেড়া দিয়ে দখলে নেওয়া হয়।

সম্প্রতি উপজেলায় ইউনিয়ন ভিত্তিক আন্তঃস্কুল ফুটবল টুর্ণামেন্ট শেষ হয়েছে। এতে প্রায় সবকটি ইউনিয়নেই ছোট-বড় মারামারির ঘটনা ঘটেছে। মারামারির করার দায়ে কাকড়াজান ইউনিয়নের মহানন্দপুর বিজয় স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়কে পাঁচ বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

সখীপুরের একাধিক ব্যক্তির জানান, উপজেলায় প্রতিদিনই কোন না কোন এলাকায় খুন, ধর্ষণ ও চুরির মতো ঘটনা ঘটছে। প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আরও বেশি সক্রিয় হয়ে কাজ না করলে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে সখীপুর।

এ ব্যাপারে বিআরডিবি ভাইস চেয়ারম্যান এম সাইফুল ইসলাম শাফলু বলেন, সারাক্ষণ আতঙ্কিত থাকি। সখীপুর এখন অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। প্রশাসন, রাজনীতিবিদ, সমাজপতিরা এ দায় এড়াতে পারে না। আমরা নিরাপদ সখীপুর দেখতে চাই।

নলুয়া বাছেত খান উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুমন রানা বলেন, সখীপুরে দিন দিন অপরাধ বেড়েই চলছে। এজন্য স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি আমাদের আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে।

সখীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, শুধু সখীপুরে নয় সারাদেশেই অপরাধ বেড়ে গেছে। অপরাধ নির্মূলে পুলিশ কাজ করছে। প্রতিটি ঘটনার পিছনেই পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করছে। ইতোমধ্যে অনেক ঘটনার রহস্য উদঘাটনও করা হয়েছে। অপরাধীরা অপরাধ করে পার পাবে না।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি ফারজানা আলম বলেন, সর্বত্রই অচিরেই যৌথ অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *