নিজস্ব প্রতিবেদক: টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল উদ্বোধনের প্রায় তিন বছর পরেও এখনো পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু হয়নি। এতে সাধারণ মানুষ তীব্র জনবল সংকটে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা দ্রুত পূর্ণাঙ্গ সেবা চালুর দাবি জানালেও এখানে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও লোকবল না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে জেলার প্রায় ৪০ লাখ মানুষকে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ২০০ রোগী চিকিৎসা নেন। বহির্বিভাগে ১০৫ জন চিকিৎসক প্রয়োজন হলেও আছেন মাত্র ২৪ জন। এছাড়া অন্তঃবিভাগে আইসিইউ, নাক-কান-গলা, চক্ষু ও অর্থোপেডিক ওয়ার্ডের কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। আইসিইউ ওয়ার্ডে ২০টি বেডের মধ্যে ১০টি প্রস্তুত করা হলেও জনবল সংকটে তা চালু করা সম্ভব হয়নি। ৩৬ জন টেকনিশিয়ান প্রয়োজন হলেও হাসপাতালে একজনও নেই।
ইনডোরে ১১৬ জন চিকিৎসকের স্থলে আছেন ২০ জন। ১৯৩ জন নার্সের বিপরীতে আছেন ১৮৭ জন, আরও ২০০ নার্সের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ২১০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর জায়গায় কাজ করছেন মাত্র ৩৭ জন। পাশাপাশি ব্রেইন পরীক্ষার ইলেকট্রো এনসেফালোগ্রাম (ইইজি), হার্টের রিং পরানোর ক্যাথল্যাব ও এনজিওগ্রাম মেশিনের সংকট রয়েছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, কার্ডিওলজি বিভাগে ১৮টি বেড থাকলেও যান্ত্রিক ত্রুটি ও জনবলের অভাবে ক্যাথল্যাব চালু করা যায়নি। লোকবল না থাকায় কেবিনের জন্য বরাদ্দ ৮০টি বেডও অব্যবহৃত পড়ে আছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এমআরআই সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে।
চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা জানান, এই হাসপাতালে পর্যাপ্ত সেবা পাওয়া যায় না। অনেক ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়। রোগীর অবস্থা জটিল হলেই ঢাকায় রেফার করা হয়। দেলদুয়ারের কেউরিয়া থেকে আসা নুরুল ইসলাম বলেন, রোগীর প্রচণ্ড চাপ থাকায় মেঝেতে শুয়েই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। টাঙ্গাইলের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও আমাদের ঢাকায় যেতে হচ্ছে। একই উপজেলার নাল্লাপাড়া গ্রামের আবু সাঈদ বলেন, হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে কষ্ট হচ্ছে, তার ওপর বাথরুমগুলোও খুব নোংরা।
মধুপুর থেকে আসা হাবিব মিয়া বলেন, প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূর থেকে এসেও ঠিকমতো চিকিৎসা পাচ্ছি না। চিকিৎসকরা সময় কম দেন। আবার হাসপাতালের দালালরা অনেক ক্ষেত্রে বাইরের ক্লিনিকে যাওয়ার পরামর্শ দেয়।
স্থানীয়রা জানান, ২০১৪ সালের শুরুতে এই হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০২২ সালে গণপূর্ত বিভাগ ভবনটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেয়। ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এটি উদ্বোধন করেন। কিন্তু উদ্বোধনের তিন বছর হতে চললেও সেবা কার্যক্রম এখনো অপূর্ণাঙ্গ।
সরেজমিনে দেখা যায়, বহির্বিভাগে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক রোগী সেবা পাচ্ছেন না। জরুরি বিভাগেও একই চিত্র। মেডিসিন ওয়ার্ডে নির্ধারিত আসনের চেয়ে দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকায় বেশির ভাগই মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ ছাড়া হাসপাতালে কোনো সরকারি অ্যাম্বুলেন্স নেই, বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়াও অনেক বেশি নেওয়া হচ্ছে।
টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. আবদুল কুদ্দুস বলেন, জনবল ঘাটতির কারণে অনেক বিভাগ চালু করা সম্ভব হয়নি। হাসপাতালে ৮৬০টি পদের বিপরীতে সৃষ্ট পদ রয়েছে মাত্র ৩২২টি। ২৫০ জন চিকিৎসক প্রয়োজন হলেও আছেন মাত্র ৫৫ জন। নার্স প্রয়োজন সাড়ে চারশ, আছেন মাত্র ১৮০ জন। তিনি আরও বলেন, আমাদের কোনো অ্যাম্বুলেন্স নেই, তবে আবেদনের প্রেক্ষিতে তা পাওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। অবকাঠামোগত কিছু ঘাটতিও রয়েছে। জনবল ও অবকাঠামো সংকটের কারণে বর্তমানে সীমিত আকারে সেবা দেওয়া হচ্ছে। সেবার মান বাড়াতে দ্রুত জনবল নিয়োগ প্রয়োজন।